
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের (আইএমএসও) ২৩তম আসরে বাংলাদেশের খুদে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। যদিও ২০১৮ সালে রোমানিয়ায় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে দেশের প্রথম সোনার পদক জয়ের সময়েও উপস্থিত ছিলাম। তাহমিদ শুধু সোনার পদক জয় করেনি, পাশাপাশি সে তত্ত্বীয় অংশে সেরাদের সেরা শিক্ষার্থী হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার দলটি সম্পর্কে আরও কিছু বলা যাক।
১৩ বছরের কম বয়সী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশের ১৬ সদস্যের দলের ১৫ জনই পদক অর্জন করেছে।
এর মধ্যে একটি স্বর্ণ, সাতটি রৌপ্য ও সাতটি ব্রোঞ্জ পদক এসেছে আমাদের ঘরে।
এটি অনূর্ধ্ব ১৩ বছর বয়সী শিশুদের এই বৈশ্বিক আসরে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের গৌরবময় ঘটনা।
গণিত বিভাগে অংশগ্রহণকারী দলের আটজনের সবাই পদক পেয়েছে। গণিত দলের আটজনের সবাই ঢাকার একটি স্কুলেরই শিক্ষার্থী, সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের।
স্বর্ণজয়ী তাহমিদ হাসান রাজধানীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।
দলের সবচেয়ে ছোট দুজন শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। দলের এই অর্জনের পেছনে শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম এবং মেন্টর বা প্রশিক্ষকদের বিশেষ অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভুলগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে শেখানোর মাধ্যমেই এই সাফল্য এসেছে।
তবে সাফল্যের এই আনন্দের মধ্যেও দেশে ফেরার পথে গভীর এক উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আয়োজিত প্রায় পাঁচ ঘণ্টার একটি নাগরিক সংলাপে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র উঠে আসে। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বহু সূচক গুচ্ছ জরিপ (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৬০ দশমিক ৮ শতাংশই মৌলিক গাণিতিক দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ। এমনকি প্রায় ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু বয়স উপযোগী সহজ একটি গল্প পড়েও এর অর্থ বুঝতে পারে না। যে বয়সের শিশুরা বিদেশে গিয়ে স্বর্ণপদক জিতে আসছে, আমাদের দেশের সেই বয়সের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন সাধারণ অংক কষতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল গুটিকয়েক মেধাবীর ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে, যেখানে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান অত্যন্ত নিম্নগামী। আরও মনে পড়ে তার কয়েক দিন আগে প্রকাশিত একটি জাতীয় শিক্ষা জরিপের ফল। অর্থাৎ যে বয়সের একটি শিশুকে আমি পশ্চিম জাভায় সোনা জিততে দেখলাম, সেই বয়সের প্রতি ১০ জনের ৬ জন দেশে সাধারণ অঙ্ক কষতে পারে না। ১৯ সেপ্টেম্বর এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজন করেছিল ‘সরকার কতখানি এগোল। ক্ষুধার্ত শিশু শিখতে পারে না, আর রাজনৈতিক প্রভাবে বানানো স্কুলভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কিন্তু পাঁচ ঘণ্টায় শিশুরা পড়তে শিখছে কি না, অঙ্ক কষতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে এল না, আশপাশে ঘোরাঘুরি করল, এমনকি কয়েক দিন আগে সংবাদমাধ্যমে আসা এমআইসিএসের সংখ্যাগুলোও নয়। যে প্রযুক্তি নিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রে এখন শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হচ্ছে, পাঁচ ঘণ্টার একটি শিক্ষা-সংলাপে সেটি জায়গা পেল না। এসব গোনা সহজ, ছবি তোলা সহজ, ফিতা কাটাও সহজ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই সংলাপে উঠে এসেছে যে, প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ২৪টি প্রতিশ্রুতির একটিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬-২০৩১ মেয়াদের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মিড ডে মিল প্রকল্পের দরপত্র জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা ও অর্থের অপচয়। অথচ শিশুদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বারবার আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খানের মতো গবেষকরাও এই সামগ্রিক ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী। এরপর আলোচনা গড়াল দুর্গম এলাকায় দুপুরের খাবারের (মিড ডে মিল) দরপত্রে সরবরাহকারী না পাওয়া, প্রকল্পকাঠামোর জটিলতা, বিদ্যালয় নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাব, বরাদ্দের টাকা খরচ না হওয়া, শিক্ষকদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ—এসব বিষয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান মৌলিক দক্ষতা আর পাঠাভ্যাসের কথা তুলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেছিলেন শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা।
আমাদের শিক্ষানীতি দীর্ঘ সময় ধরে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে আসছে। কতগুলো স্কুল ভবন তৈরি হলো, কতগুলো বই ছাপা হলো কিংবা কত ট্যাব বিতরণ করা হলো—এসব হিসাব মেলাতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু বছরের শেষে তৃতীয় শ্রেণির কত শতাংশ শিশু প্রকৃতপক্ষে পড়তে শিখল, সেই জবাবদিহিতার জায়গাটি বরাবরই উপেক্ষিত। অথচ শিক্ষাকে যদি সত্যিই মানসম্মত করতে হয়, তবে শেখার দক্ষতাকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে যখন বিজ্ঞানের স্বর্ণপদকের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির তাহমিদ হাসানের নাম ঘোষণা হলো, সেই মুহূর্তের আনন্দের অনুভূতি লিখে বোঝানো কঠিন। অথচ আমরা প্রায় সব শিশুকে স্কুলে আনতে পেরেছি, ছেলেমেয়ের সমতাও এনেছি। এ ছাড়া দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি কে হবেন তা নিয়ে।
ভবিষ্যৎ শিক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভূমিকা নিয়ে মুনির হাসান তার নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন। তার মতে, এআইকে কেবল বিতরণের বস্তু হিসেবে না দেখে শিক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চীন বা ভারত যেখানে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কম্পিউটেশনাল থিঙ্কিং বা এআই ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা সাজাচ্ছে, সেখানে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জরুরি। সরাসরি উত্তর প্রদানকারী এআইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তুরস্কে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সাহায্য নিয়ে যারা সরাসরি উত্তরের ওপর নির্ভর করে, তারা সৃজনশীল পরীক্ষায় খারাপ ফল করে। তাই সঠিক মেন্টরিং এবং ইঙ্গিতমূলক এআই টিউটর ব্যবহার করাই হবে কার্যকর পথ। অর্থাৎ যে কর্মসূচির মেয়াদ শুরু হয়ে গেছে, তার কাগজই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আমি শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কিছু কথা বলতে চেয়ে সঞ্চালকের কাছে স্লিপ পাঠিয়েছি, যদিও সুযোগ পাইনি। গত মাসে প্রথম আলোতেই লিখেছিলাম, আমাদের জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের অনলাইন বাছাইয়ে কেউ কেউ ১৫টি প্রশ্নের উত্তর ১৫ মিনিটের কম সময়ে দিয়েছে, সম্ভবত প্রশ্নের ছবি তুলে এআইকে দিয়ে। অন্যদিকে উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিত ও পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে সাহায্য করা এআই টিউটর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তেমন ক্ষতি দেখা যায়নি (আপনার বাচ্চাকে অঙ্কটার সঙ্গে একটু থাকতে দিন,, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। এটা আমাকে যতটা না ব্যক্তিগতভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবিয়েছে আমাদের অগ্রাধিকার নিয়ে।
পরিশেষে, দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ভাগ্যোন্নয়নই শিক্ষার আসল পরীক্ষা। পদকের মানচিত্র কেবলই বলে দেয় মেধা কোথাও কোথাও ভালো চর্চার সুযোগ পায়। কিন্তু সত্যিকারের জাতীয় সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ লাখো শিশুর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর। পরবর্তী নাগরিক সংলাপে মিড ডে মিলের মতো প্রশাসনিক বিষয়ের পাশাপাশি ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর অদক্ষতার বিষয়টি প্রাধান্য পেলে বোঝা যাবে, আমরা সঠিক প্রশ্নগুলো করতে শিখছি।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.