
শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়া এলাকার একটি অংশ এখন ‘প্রেমতলা’ নামে পরিচিত। ক্লান্ত পথচারীরা গাছটির ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন।
তবে চার দশক আগেও এখানে এমন জৌলুস ছিল না।当時 এলাকাটি পরিচিত ছিল ‘কোটাপাড়া’ নামে। এর প্রায় ৭৫০ মিটার পশ্চিমে কীর্তিনাশা নদীর কোলঘেঁষে আরেকটি গ্রাম রয়েছে যার নামও কোটাপাড়া। একই নামের দুটি জায়গা থাকায় পথচারী ও যানবাহন চালকরা প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়তেন। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই স্থানীয় কিশোর ও তরুণরা নতুন নাম দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসের এক বিকেলে বটগাছের নিচে আড্ডা দেওয়ার সময় স্থানীয় মকবুল চৌকিদার জায়গাটির নাম ‘প্রেমতলা’ রাখার প্রস্তাব দেন। উপস্থিত সবাই এতে সম্মতি জানান। পরদিন কিশোররা মিলে একটি টিনের সাইনবোর্ডে ‘প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড’ লিখে সেই বটগাছে ঝুলিয়ে দেন, যা থেকে এলাকাটি তার বর্তমান পরিচিতি পায়। বর্তমানে প্রেমতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন সেই মকবুল চৌকিদার। আশপাশের গ্রামের কিশোর-তরুণেরা সেখানে বসে আড্ডা দিতেন, খেলাধুলা করতেন। কিন্তু একই এলাকায় কাছাকাছি দূরত্বে দুটি কোটাপাড়া থাকায় পথচারী ও যানবাহনের চালকদের বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো। সেই বিভ্রান্তি দূর করতে একটি কোটাপাড়ার নামকরণ করা হয় ‘প্রেমতলা’। সেখানেই একদিন আলোচনা ওঠে, দুটি কোটাপাড়ার নামের কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি কীভাবে দূর করা যায়। আলোচনার এক পর্যায়ে একটি কোটাপাড়ার নতুন নাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে শরীয়তপুর জেলা ঘোষণার পর থেকেই এলাকাটির চেহারা বদলাতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে জেলায় প্রথম বাস চলাচল শুরু হলে প্রেমতলা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাট থেকে প্রেমতলা হয়ে নড়িয়া উপজেলার বাঁশতলা পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ কিলোমিটার রুটে চলাচল করত বাস। তৎকালীন চালক সবুজ ভূঁইয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সময় রাস্তার দুই পাশে ফসলি জমি ছিল এবং বড় বটগাছটির নিচে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হতো। অথচ বর্তমানে সেই বটগাছটির অস্তিত্ব নেই, প্রায় ১০ বছর আগে সেটি কেটে ফেলা হয়েছে। সময়ের আবর্তে ফসলি জমিগুলো এখন কংক্রিটের বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালের মার্চে শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সড়ক সংস্কারে পর ওই পথে বাস, রিকশা ও ভ্যান চলাচল শুরু করে। গত ২৭ অক্টোবর এক বন্ধুকে নিয়ে এলাকায় এসে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করেন তিনি। সবুজ ভূঁইয়া বলেন, ‘১০ বছর হলো বাস চালানো ছেড়েছি।
আজকের প্রেমতলায় কেবল বাজারই নয়, বরং গড়ে উঠেছে বিসিক শিল্পনগরীসহ নানা সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। এখানে প্রায় ১২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ৩০টির বেশি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যালয়ও স্থাপিত হয়েছে এই এলাকায়। এলাকার বাসিন্দা ও প্রবীণ দোকানি আবদুর রব হাওলাদার, যিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এখানে চা ও কনফেকশনারির ব্যবসা করছেন, জানান, ৩৬ বছর আগে যেখানে কৃষিকাজ করতেন, আজ সেখানেই ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পলাশ চন্দ্র রায়ও এই পরিবর্তনের সাক্ষী। তাঁর কথায়, যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে সেই নির্জন মাঠ ও মেঠো পথের দিনগুলো হারিয়ে গেলেও প্রেমতলা নামটি এখনো সেই আড্ডার স্মৃতি বহন করে চলেছে। সেই মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠো পথ। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রেমতলা। তবে প্রেমতলা নামকরণের গল্পে জড়িয়ে আছে কয়েকজন কিশোর-তরুণের আড্ডা, একটি বটগাছ এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি। ১৯৮৮ সালের বন্যায় জেলা শহর থেকে বাঘিয়া এলাকার দিকে যাওয়া মেঠো পথটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে শরীয়তপুরের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন ঢাকা, নড়িয়া, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের সাথে যোগাযোগের অন্যতম সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে প্রেমতলা। প্রতিদিন এখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে, যা এলাকাটিকে পৌরসভার অন্যতম জনবহুল ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ দিয়েছে। ৩৬ বছর আগে যে নির্জন মেঠো পথ ছিল কৃষকদের যাতায়াতের মাধ্যম, তা আজ আধুনিক শরীয়তপুরের উন্নয়নের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবুও এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের আলাপচারিতায় আজও ফিরে আসে সেই বটগাছের ছায়া আর কিশোরবেলার সেই সহজ-সরল আড্ডার দিনগুলোর কথা। সেই মেঠো পথ একসময় ইট বিছানো সড়কে পরিণত হয়। ঢাকা-শরীয়তপুর, নড়িয়া-শরীয়তপুর এবং শরীয়তপুর থেকে ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলো এসে মিলেছে এ এলাকায়। আমাদের কয়েকজনের দেওয়া নামটি একদিন জনবহুল একটি এলাকার নাম হয়ে যাবে, তা বুঝতে পারিনি।’।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.