
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গর্জনীয়া রহমানিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক মুনির আহমেদ। ৪৪ বছর বয়সী এই শিক্ষক শহরের কোলাহল থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরের এই প্রতিষ্ঠানে নিজের কাজের মাধ্যমে নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন। শ্রেণিকক্ষে তিনি কেবল বইয়ের পাতার পাঠ্যই পড়ান না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান বা যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় আরবি ভাষা রপ্ত করতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখান কমিউনিকেটিভ পদ্ধতিতে। গত ১৫ অক্টোবর মাদ্রাসায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সেই সকালে বোর্ডে বিমানবন্দরে কথপোকথনের একটি সংলাপ লিখে তিনি শিক্ষার্থীদের বাস্তব অনুশীলনে উৎসাহিত করছিলেন। শ্রেণিকক্ষের সাদা বোর্ডে আরবিতে একের পর এক বাক্য লিখে চলেছেন মাওলানা মুনির আহমেদ। দুজন দুই ভূমিকায় বোর্ডের সংলাপ বলে যায়, ভুল হলে শিক্ষক ধরিয়ে দেন। এভাবে পড়ানোর কারণও জানালেন মুনির আহমেদ। জীবিকার খোঁজে এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে যান, কিন্তু ভাষা না জানায় অনেকে বিপাকে পড়েন। তাঁর মতে, ভাষাটা রপ্ত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ, ব্যবসা বা পড়াশোনায় সুবিধা হয়। মাসের আয় নিয়ে মুনির আহমেদ বলেন, ‘কষ্ট হয় না, তা বলব না।
মুনির আহমেদের শিক্ষকতার যাত্রার শুরুটা অবশ্য নিজ ইচ্ছাতেই।
চট্টগ্রামের আনোয়ারার গহিরায় বেড়ে ওঠা এই শিক্ষকের পাঁচ ভাই ও তিন বোনের পরিবারে তিনিই একমাত্র মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল সম্পন্ন করেন তিনি। পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময় ফাজিল-কামিলের স্নাতক সমমানের স্বীকৃতি না থাকায় তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করতে হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালে এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রভাষক হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে কক্সবাজার ও বোয়ালখালীর দুটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পর ২০১৯ সালে বর্তমান কর্মস্থলে যোগ দেন। এরপর সামনে ডেকে আনেন এক ছাত্র ও এক ছাত্রীকে। ২০১৬ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) প্রভাষক (আরবি) নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিকেল চারটায় মাদ্রাসা থেকে ফেরেন, মাগরিবের পর নেন পরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতি।
তাঁর প্রতিদিনের রুটিন শুরু হয় ফজরের নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। সকাল পৌনে দশটায় মাদ্রাসায় পৌঁছানোর পর দিনে তিনি চারটি থেকে পাঁচটি ক্লাস নেন। নবম শ্রেণি থেকে ফাজিল পর্যায় পর্যন্ত কোরআন, হাদিস, আরবি সাহিত্যসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি তিনি নৈতিকতার শিক্ষা দেন। সুদের কুফল বা ঘুষ থেকে দূরে থাকার মতো জীবনবোধের শিক্ষায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন। তিনি মনে করেন, মাদ্রাসার শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন জরুরি।
মুনির আহমেদ ব্যক্তিগত জীবনেও শিক্ষার প্রসারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। চট্টগ্রাম শহরে থাকা স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসার সামলানোর পাশাপাশি তিনি সপ্তাহে ছুটির দিনে পরিবারের কাছে যান। বড় মেয়ে একটি মহিলা মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণিতে পড়ছে এবং ছোট মেয়ের বয়স আড়াই বছর। তিনি দুই মেয়েকেই মাদ্রাসায় পড়াতে আগ্রহী। তবে সন্তানদের পেশা নির্বাচন নিয়ে তাঁর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শিক্ষক মুনির আহমেদ স্পষ্ট বললেন, সন্তানরা যেন ভবিষ্যতে কেবল চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে না ছুটে, বরং সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে—সেটিই তাঁর মূল লক্ষ্য। বললেন, ‘ছোটবেলায় পরিবারের সবাই চাইতেন আমি মাদ্রাসায় পড়ি।
আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে এই শিক্ষক জানান, শিক্ষকতা পেশায় থেকে অনেক সময় টানাপোড়েনে পড়তে হয়, তবে সততার সাথে দায়িত্ব পালনই তাঁকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। কোনোভাবেই মানিয়ে নিয়ে পেশার প্রতি মমতা ধরে রাখতে চান তিনি। তাঁর কাছে প্রকৃত শিক্ষার মানে কেবল সনদ অর্জন নয়, বরং সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার পথে অবিচল থাকা। শিক্ষার্থীরা যখন বাস্তব জীবনে এই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়, তখনই তিনি শিক্ষক হিসেবে পরম সার্থকতা অনুভব করেন। অন্য শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে দেখে। তারপরও কোনোভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.