
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কিছুটা কমলেও, বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ক্রয়াদেশ এবং আমদানির গতি নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) সংকলিত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানির আর্থিক মূল্য ছিল ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম। একই সঙ্গে আমদানির মোট পরিমাণ ছিল ৩০৬ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার কেজি, যা ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। এই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৬৫ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। তবে বিএভির হিসাবে, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা বাজারে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
এই সামগ্রিক পতনের পেছনে ২০২৫ সালের উচ্চ আমদানির ভিত্তি ভূমিকা রেখেছে।
গত বছর ইইউর পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছেছিল।
একই সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বছরের শুরুতে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতাদের হাতে প্রচুর পরিমাণ পণ্য মজুত ছিল। বসন্তে খুচরা বিক্রিও তুলনামূলক ভালো ছিল।
এর ফলে নতুন বছরের শুরুতে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার আগ্রহ ছিল কম। এছাড়া ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের আস্থা ৪০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসাও আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ফলস্বরূপ, জানুয়ারিতে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে যায়। এতে নতুন করে ক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রবণতা জোরদার হয়।
তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে চিত্রটি বদলাতে শুরু করে। খুচরা বিক্রেতারা তাদের মজুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মে মাসে ইইউর খুচরা বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়লে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। গ্রীষ্মের শেষ ও শীতের মৌসুমের পোশাকের চাহিদাও আমদানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ১১৯৩ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩৫০ কোটি ইউরো। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পোশাকের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি হয়েছে এবং প্রতি কেজির গড় মূল্য ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। ফলে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৭ কোটি ইউরো। দেশটির রপ্তানিতে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে। দেশটির প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৮ ইউরো, যা প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে কেবল চীনেরই রপ্তানি মূল্য ও পরিমাণ উভয়ই বেড়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ১৯৭১ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে এবং বাজারে তাদের হিস্যা ৩০ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ করে হ্রাস পেয়েছে। পাকিস্তান যদিও রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়িয়েছে, তবে তারা প্রতি কেজির গড় মূল্য ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমিয়েছে। ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকা জরুরি। ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ইইউর জিডিপি ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে, যা এই প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে সক্ষম। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলতি বছরে ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে আনুমানিক ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছে।
সদ্য ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা ইউরোপের খুচরা বাজারে নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রায় দেড় হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ওই দিন পোশাক বিক্রয় থেকে আয় গড়ে ১৪ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও একই ধরনের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বড়দিনকেন্দ্রিক কেনাকাটা যদি প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হয়, তবে ২০২৭ সালের শুরুতে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের মুখে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি পণ্য পাঠায়। চীন বাজারের অংশ বাড়াচ্ছে, ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য রপ্তানি করছে, আর বাংলাদেশকে রপ্তানি আয় ও বাজার হিস্যা, দুই ক্ষেত্রেই চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এরসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চীনের শক্তিশালী অবস্থান, সম্ভাব্য দুর্বল বড়দিনের বিক্রি এবং ২০২৭ সালের নতুন বাণিজ্যনীতির প্রভাব।
নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) কার্যকর হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এই নতুন বাণিজ্য নীতিগুলো ইউরোপের পোশাক বাজারে বিদ্যমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের তথ্য বাজারের ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। পাশাপাশি জিএসপি বিধিমালার পরিবর্তনও বাংলাদেশের বাজারসুবিধা ও প্রতিযোগিতার অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে আগামী দিনে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে মূল্য প্রতিযোগিতা, পণ্যের গুণগত মান এবং সরবরাহ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.