কুড়িগ্রামে ভুটানের প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে তৎপরতা বাড়ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাইয়ে কুড়িগ্রামে এসে একদিনে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল, চিলমারী নৌবন্দর ও সোনাহাট স্থলবন্দর ঘুরে দেখেছে ভুটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি অথরিটি (GMCA)-এর একটি প্রতিনিধি দল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে চিলমারী নৌবন্দর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের কুড়িগ্রাম সফর। পরে ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট স্থলবন্দরে গিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, ইমিগ্রেশন, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তথ্য নেয় প্রতিনিধি দলটি। বিকেলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ধরলা সেতুর পূর্ব পাড়ে ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মাধবরাম মৌজায় প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান পরিদর্শন করে তারা।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন GMCA-এর উপপরিচালক (আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বিষয়াদি) কালডেন দর্জি, সহযোগী পরিচালক নিম লাম এবং ঢাকায় রয়্যাল ভুটানিজ দূতাবাসের মিনিস্টার-কাউন্সিলর (বাণিজ্য) দাওয়া শেরিং। সফরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরাও ছিলেন।
একসঙ্গে তিন গন্তব্য, খোঁজা হচ্ছে বাণিজ্যপথ
প্রতিনিধি দলের চিলমারী, সোনাহাট ও মাধবরাম পরিদর্শনকে নিছক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে পণ্য কীভাবে চিলমারী নৌবন্দর ও সোনাহাট স্থলবন্দর হয়ে আঞ্চলিক বাজারে যাবে—মূলত সেই সম্ভাবনাই সরেজমিনে যাচাই করা হচ্ছে।
সোনাহাট স্থলবন্দরে প্রতিনিধি দলটি জানতে চায়—বর্তমানে কী ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, বন্দরের সক্ষমতা কতটুকু, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা কেমন এবং ভবিষ্যতে ভুটানের সঙ্গে কী ধরনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ এবং সোনাহাট স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. বদিউজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে তথ্য নেয় তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর, কয়লা, তাজা ফল, ভুট্টা, গম, চাল, ডাল, রসুন, আদা ও পেঁয়াজসহ ২২ ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ রয়েছে। ভুটান থেকেও পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। বর্তমানে ভারত থেকে পাথর ও কয়লা আমদানি হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস ঝুট, প্লাস্টিক পণ্য, জুস, টয়লেট টিস্যু, মশারি, বই ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়।
মাধবরামে অর্থনৈতিক অঞ্চল, জমি প্রস্তুত
মাধবরাম এলাকায় প্রস্তাবিত ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা প্রায় ১৩৩ একর জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও প্রায় ৮৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
বেজার কর্মকর্তারা জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন শেষে ভুটানের প্রতিনিধিরা প্রকল্পটির বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি নতুন রুট তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
গেলেফু থেকে কুড়িগ্রাম মাত্র ১৯০ কিলোমিটার
ভুটানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গেলেফু থেকে কুড়িগ্রামের প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ১৯০ কিলোমিটার। ভৌগোলিক এই নৈকট্যই প্রকল্পটির অন্যতম বড় আকর্ষণ।
ভুটানের গেলেফুতে বর্তমানে বৃহৎ আকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফলে গেলেফুর সঙ্গে কুড়িগ্রামের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সংযোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজার পদচিহ্নের পর প্রতিনিধি দলের সফর
কুড়িগ্রামে ভুটানের অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত এইচ ই রিনচেন কুইন্টসি প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন।
এর ১৮ দিন পর, ২৮ মার্চ ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকও মাধবরাম এলাকায় প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান পরিদর্শন করেন। চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে ওইদিন তিনি সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত হয়ে সড়কপথে ভুটানে ফেরেন। সোনাহাটে তাকে বিজিবির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার ও বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
রাজা ওয়াংচুকের সফরের সময় বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে কুড়িগ্রামে ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।
সামনে যৌথ কর্মপরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, GMCA-এর প্রতিনিধি দলটি ৩১ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করছে। সফরের অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (BEZA) সঙ্গে বৈঠক এবং কুড়িগ্রামের বাণিজ্যিক অবকাঠামো সরেজমিনে দেখা।
আসন্ন BEZA-GMCA Joint Working Group Meeting-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এবারের সফর। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কুড়িগ্রামের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল, সোনাহাট স্থলবন্দর ও চিলমারী নৌবন্দর ঘুরে যোগাযোগব্যবস্থা, দূরত্ব, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
বদলে যেতে পারে কুড়িগ্রামের অর্থনীতি
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ভুটানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন হলে কুড়িগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। শিল্প-কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থান, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবসার সুযোগ। বাড়তে পারে সোনাহাট স্থলবন্দর ও চিলমারী নৌবন্দরের কার্যক্রমও।
চিলমারী নৌবন্দর, সোনাহাট স্থলবন্দর এবং মাধবরামের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল—এই তিন অবকাঠামোর সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কুড়িগ্রাম হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ-ভুটান বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
ভুটানের প্রতিনিধি দলের এবারের সরেজমিন পরিদর্শন তাই শুধু একটি প্রকল্পের জায়গা দেখা নয়; বরং কুড়িগ্রামকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্কের রূপরেখা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.