
মাত্র এক টাকা জরিমানা। এই সামান্য অঙ্কের টাকা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে গিয়ে জমা দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রীতিমতো ঝক্কির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইব্রেরির বই নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে আট-নয় দিন দেরিতে জমা দেওয়ার কারণে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ডিজিটাল যুগে এসে এই ধরনের সেকেলে নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। তবে এই হার প্রতি সপ্তাহের জন্য, নাকি উল্লিখিত সময়ের জন্য মোট জরিমানা, তা স্পষ্ট নয়।
বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হক।
তিনি জানান, পূজার ছুটির কারণে বই জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় তাঁকে এই জরিমানা গুনতে হচ্ছে। তাঁর দেওয়া ফরমের ছবিতে দেখা যায়, গত ৩ নভেম্বর একজন কর্মকর্তা সেখানে স্বাক্ষর করেছেন। এক টাকার জন্য ব্যাংকে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তিনি অযৌক্তিক ও বিরক্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পূজার ছুটির মধ্যে বই ফেরত দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ পড়ায় তিনি সময়মতো বইটি জমা দিতে পারেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধীন সায়েন্স লাইব্রেরিতে এই নিয়ম কার্যকর রয়েছে। যদিও প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব লাইব্রেরি আলাদা নিয়মে চলে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ও বিজ্ঞান পাঠাগারে বছরের পর বছর ধরে এই পদ্ধতি বহাল। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৯ মে নতুন নকশার নোটের তালিকায় এক টাকার নোট না রাখলেও ধাতব মুদ্রা বা কয়েন হিসেবে এর প্রচলন এখনো রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, লাইব্রেরির ওয়েবসাইটের ‘ফাইন ডিটেইলস’ এবং অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালায় জরিমানার হারের ভিন্নতা রয়েছে।
ওয়েবসাইটের এক অংশে প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা, তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে এক টাকা এবং পঞ্চম সপ্তাহ থেকে তিন টাকা জরিমানার কথা বলা হলেও, অধ্যাদেশে প্রতি সপ্তাহে ২৫ পয়সা জরিমানার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তাঁর নাম, বিভাগ, হল ও গ্রন্থাগার কার্ডসংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি জরিমানার পরিমাণ লেখা রয়েছে ‘এক টাকা’। জরিমানার মুখে পড়া ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। অন্যদিকে একই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪ নম্বর বিধানে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বইয়ে প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষের বিলম্বে ২৫ পয়সা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী হিসাব দপ্তরে নগদ টাকা জমা নেওয়ার বিধান থাকলেও বর্তমানে ব্যাংকে যাওয়ার নিয়মটিই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় যখন ধাপে ধাপে অন্যান্য ফি অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে, তখন গ্রন্থাগারের জরিমানা কেন ব্যাংকে গিয়ে দিতে হবে? শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম বলেন, অনেক সেবা এখন অনলাইনে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। মাত্র এক টাকার জন্য ব্যাংকে লাইনে দাঁড়ানোর ভোগান্তি কমানো এখন সময়ের দাবি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিরসনেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হকও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। যদিও বর্তমানে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই, তবুও অল্প অঙ্কের জরিমানা অনলাইনভিত্তিক করা যায় কি না, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এক টাকার জন্য ব্যাংকের দিকে যাওয়াটাই বিরক্তিকর।’।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মনে করেন, এই প্রক্রিয়াটি একধরনের শাস্তির মতো কাজ করে, যাতে শিক্ষার্থীরা বই ফেরতের বিষয়ে সতর্ক থাকেন। তবে তিনিও পুরোনো এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েছেন।
সহ-উপাচার্য আশ্বস্ত করেছেন যে, এসব সেবা অতি দ্রুত অনলাইনভিত্তিক করা হবে। শিক্ষার্থীরা যেন কিউআর কোড স্ক্যান করে বা ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমেই এই জরিমানা পরিশোধ করতে পারেন, সেই লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ শুরু করছে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম বর্ষের ফি অনলাইনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু গ্রন্থাগারের এই এক টাকার ক্ষেত্রে এখনো আগের সেই পুরোনো ব্যাংক নির্ভরতা রয়েই গেছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে জরিমানা পরিশোধের এই প্রক্রিয়াটি অনলাইন সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটেই বই ফেরতে দেরির জরিমানার দুটি ভিন্ন হার পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.