
স্নাতক শেষ হওয়ার মুহূর্তটি অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবনে এক সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর মায়ের হাতের খাবারের যে জীবন, তা চোখের পলকে বদলে যায় ইন্টারভিউ, সিভি ড্রপ আর চাকরির পরীক্ষার কঠিন বাস্তবতায়। বর্তমান সময়ে এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশ যাত্রার নতুন এক দুশ্চিন্তা। জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশে উচ্চশিক্ষারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ হাজার ৮০০। অথচ এক দশক আগে ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৪ হাজারের কিছু বেশি, যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে গত দশকে বিদেশে পড়তে যাওয়ার হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সকালে ক্লাস, এর ফাঁকে আড্ডা, দুপুরে বাড়ি এসে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে আরামের এক ভাতঘুম। চাকরি, ইন্টারভিউ, সিভি—এ যেন হুট করে বড় হওয়ার চেষ্টা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে নতুন চিন্তা—বিদেশ যেতে হবে। ভর্তিযুদ্ধ নামক চ্যালেঞ্জে হেরে যাওয়ার ভয়টা ছিল ব্যাপক। স্নাতকোত্তর যখন ছুঁই ছুঁই, তখন মাথায় যেন শুধুই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। এই যদি হয় চাকরির বাজার, তবে বিদেশ ছুটে যাওয়াই শ্রেয় নয়কি। যার মূলে তাঁরা চাকরি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে রাখছেন।
শিক্ষার্থীদের এমন বিদেশমুখী হওয়ার নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপ থেকেই বিদ্যমান অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এইচএসসি পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াইয়ে নামতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা যে চাপের মুখে পড়েন, তা তাদের বিরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিটি আসনের বিপরীতে গড়ে ৩৬ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যা এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী শুরুতেই বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফেলছেন। এ পথেই একটু হলেও আশার আলো দেখতে পান শিক্ষার্থীরা। এত ঝামেলার পরেও বিদেশই কেন প্রথম পছন্দ।
কানাডার সেন্ট জন শহরে বর্তমানে অবস্থান করছেন তাসমিম বিনতে করিম অমি। চার বছর আগে উচ্চমাধ্যমিক শেষে তিনি দেশ ছাড়েন। তার ভাষ্যমতে, ভর্তিযুদ্ধের সেই কঠিন অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিদেশের পথ বেছে নিয়েছিলেন। স্নাতক শেষে শিক্ষার্থীদের সামনে সাধারণত তিনটি পথ খোলা থাকে—বিসিএস পরীক্ষা, ভালো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষা দেওয়া, অথবা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো। প্রথম দুটি ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক প্রতিযোগীর ভিড় থাকায় শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার উপায় হিসেবে বিদেশকে অধিকতর নিরাপদ মনে করছেন। স্নাতক–পরবর্তী বিদেশযাত্রা নিয়ে কথা বলার আগে বলতে হয় উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপেই যাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘দেশে আমরা ছোটবেলা থেকে যে ধরনের পরিবেশের সঙ্গে বড় হয়েছি, বিদেশে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এবং পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তি বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মতে, উন্নত মানের শিক্ষার আকাঙ্ক্ষাই বিদেশযাত্রার সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি বলেন, তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশে পড়ার সুযোগ রয়েছে মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই উচ্চতর গবেষণার জন্য ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলোকে বেছে নেওয়া ছাড়া তার সামনে তেমন কোনো বিকল্প খোলা নেই। আইইএলটিএস, এসওপি এবং ব্যাংকিং সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঝক্কি সহ্য করেও তিনি উন্নত শিক্ষার জন্য বাইরে যেতেই আগ্রহী। আমার বিষয়ে বাংলাদেশে শুধু তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ আছে। ফলে বুঝতেই পারছেন, না চাইলেও ভালো সুযোগের জন্য ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতেই হচ্ছে।’।
চাকরির বাজারের ভয়াবহ সংকটও তরুণদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বেকার ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। ডিসেম্বরের নাগাদ সেই সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তির ৩৬ শতাংশই বেকার। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা বাবদ ৬৬ কোটি ডলারেরও বেশি পাঠিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা এখন দেশের চাকরির বাজারের চেয়ে বিদেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ বেশি সুরক্ষিত মনে করছেন। তবে যে কারণে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন, তাতে অনেকটাই সফল হয়েছেন।
তবে বিদেশের জীবন যে কেবল রোমাঞ্চকর, তা কিন্তু নয়। তাসমিম জানান, বিদেশের জীবনযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। তিনি জানান, চার বছর ধরে পরিবারের বাইরে আছেন এবং একবারও দেশে ফেরার সুযোগ পাননি। কানাডায় মেলামেশার জন্য মনের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও ব্যক্তিস্বাধীনতা ও উন্নত জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। স্নাতকের শেষ, কিন্তু এই শেষ মানেই কি সত্যি শেষ। পরিবার থেকে দূরে আছেন এই দীর্ঘ সময়জুড়ে।
নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার এই প্রবণতা আরও বেশি প্রবল। সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাই তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল প্রভাবক। দেশের গণপরিবহনে নিরাপত্তা সংকট, অশালীন মন্তব্য বা অল্প বয়সে বিয়ের চাপ থেকে মুক্ত থাকার আশায় অনেক নারী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমান। ২০২১ সালের জার্মানির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ২৫ শতাংশ ছাত্রী, যেখানে ছাত্রদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া ৫ হাজার ৪০৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ শতাংশ ছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
অবশ্য সবার গল্প সমান নয়। কেউ কেউ বিদেশের একা একাকী জীবনযাপন পছন্দ করছেন না। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশে বড় হওয়ার পর বিদেশের ভিন্নধর্মী সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অনেকের জন্যই কঠিন। তাদের মতে, সাহস থাকলে নিজ দেশেও ভালো কিছু করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও, ভিসার জটিলতা এবং আর্থিক চাপের ঝুঁকি জেনেও অনেকে অজানার পথে পা বাড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান একটা উৎস প্রবাসী শ্রমিক।
২০২৬ সালে কানাডা নতুন শিক্ষার্থীর জন্য ১ লাখ ৫৫ হাজার আসন নির্ধারণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার খরচ ও জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এখন জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকছেন। এ বছর জাপানের সাগা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নতুন ভর্তি হয়েছেন, যা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রেকর্ড। এছাড়াও, অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা রামরুর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী কাজের সন্ধানে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার নেশায় মেতে থাকলেও, নতুন প্রজন্মের অনেকেই আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান। এ বছর জাপানের সাগা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাড়ি জমিয়েছেন, যা প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় বিদেশি শিক্ষার্থী দল।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.