ভূমিহীন, বেকার ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্প ‘বিজয় রাকিন সিটির’ প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত।
তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী মাফিয়া, পুলিশ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নামে বেনামে এসব প্লট-ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছেন। এর ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অমুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকা এসব প্লট-ফ্লাটের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৩য় তলায় আবদুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করে বিজয় রাকিন সিটিস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি। এসময় সমিতির অন্যান্য উপদেষ্টা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্লট-ফ্লাট বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, পুরো জমিতে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ থাকলেও সুকৌশলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাকিন নামের কোম্পানীর মাধ্যমে অবৈধ চুক্তি করে ফ্লাট নির্মাণ করে। প্রকল্পটির ১৯৫০টি ফ্লাটের মধ্যে মাত্র ৮৭০টির বরাদ্দ দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির সদস্যদের নামে। অথচ এই ৮৭০টি ফ্লাটের মধ্যে মাত্র ৩২ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ৪৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। বাকী ফ্ল্যাট ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও দুর্নীতিবাজ আমলা, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতারা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
লিখিত বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন লুটপাটে সমিতির সাবেক সভাপতি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদুল আলমকে দায়ি করেন সমিতির প্রশাসক। এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী পুলিশের সাবেক আইজি ও সাবেক পিএসসি চেয়ারম্যান। প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র মোট ২৯৫ জন সদস্যের মধ্যে ১১০ জনই অমুক্তিযোদ্ধা (ভুয়া)। এই ২৯৫ জনের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান মাত্র ৫৭ জন। যার মধ্যে ২৫ জন অমুক্তিযোদ্ধা। বাকি ২৩৮ জন বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা ফ্ল্যাট পেতে হাইকোর্টে মামলা করেন (মামলা নং: ৬২৩৮/২৫)। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা ৫১৬ জন, যার মধ্যে ৩৩৪ জনই অমুক্তিযোদ্ধা। এই অমুক্তিযোদ্ধা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী মিলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৮৭০টি ফ্ল্যাট নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র সাবেক সভাপতি এ.টি আহমেদুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী মিনারা বেগমের নামে ২টি করে মোট ৪টি, প্রবাসী দুই মেয়ে তানিয়া চৌধুরী ও ত্রোপা চৌধুরীর নামে ১টি করে মোট ২টিসহ ৬টি ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে দখল করে আছেন। অথচ তিনি সমিতির বৈধ কোন সদস্য না। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম ও তার ৩৬ জন আত্মীয়’র নামে ৫৭ টি ফ্লাট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে নিজের ও স্ত্রীর নামে ২টি করে, শাশুড়ির নামে ৪টি; শালা, শালী ও শালার বউয়ের নামে ১০টি; ভাতিজা, ভাতিজি ও ভাতিজা বউয়ের নামে ১২টি; ভাগিনা, ভাগনির নামে ১৪ টি ফ্ল্যাট রয়েছে।
একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের ২ ছেলে এবং ১ মেয়ের নামে ৩টি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী এ্যাড. কামরুল ইসলামের নামে ২টি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ২ ছেলের নামে ২টি, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হকের ২ মেয়ের নামে ২ টি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. ফ. ম বাহাউদ্দিন নাসিম ও তার ভাইয়ের নামে ৪ টি, সাবেক আইন মন্ত্রী এ্যাড, আব্দুল মতিন খসরুর নামে ২টি ফ্লাট অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের সাবেক মেয়র কাজী লিয়াকত আলীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের ২২ জন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে ৪০ টি ফ্লাট বরাদ্দের নামে লুটপাট করা হয়েছে।
পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ, একেএম শহীদুল হকসহ ৫ জন আইজিপি, অতিরিক্ত আইজি ইব্রাহিম ফাতেমীসহ ৯জন অতিরিক্ত আইজিপি ভূমিহীনদের ফ্ল্যাট নিজেদের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া পুলিশের উচ্চ পদস্থ ২৩ জন কর্মকর্তার নামে ৭০ টি ফ্লাট অবৈধভাবে বরাদ্দ দেওয়া আছে। সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান ও তার পরিবারের নামে ৪টি, বিচারপতি নাঈমা হায়দারকে ১টি ও আওয়ামী লীগ সরকারের ২১ জন সচিবদের মধ্যে ২১ টি ফ্লাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সর্বমোট ১২৯ জনকে ২১৪টি ফ্লাট দেওয়া হয়েছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্পে ফ্লাট বরাদ্দ পাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তির সঙ্গে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা তাদের পরিবারের কোনো সম্পৃক্ততা নাই। এই লুটপাটের বরাদ্দের মধ্যদিয়ে ফ্ল্যাটবঞ্চিত হন ভূমিহীন, বেকার ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা। ভূলুণ্ঠিত হয় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
লিখিত বক্তব্যে আরও জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে ‘বিজয় মুক্তিযোদ্ধা সিটি’ নামকরণ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ভূমিহীন, বেকার ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের স্থায়ী আবাসনের জন্য সেবছরই মিরপুরে ১৬.০২ একর জমি বরাদ্দ দেন তিনি। একটি স্থায়ী আবাসনের প্রত্যাশায় মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৯৩ সালে ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’ গঠন করেন। ১৯৯৭ সালে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে সমিতি নিবন্ধন লাভ করে। আওয়ামী সরকার প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘বিজয় রাকিন সিটি’ নামকরণ করে।
সমিতির সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের প্রতি অভিযোগ করে প্রশাসক বলেন, মো. মোর্শেদুল আলম ও এ.টি. আহমেদুল হক চৌধুরী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে 'জুলাই হত্যা' মামলার এফআরআই ভূক্ত আসামি। তারা তাদের অবৈধ ম্পদ ও লুটপাটের ফ্ল্যাট বাঁচাতে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে সমিতির কার্যক্রম বন্ধের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সমিতির আসন্ন কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টা বন্ধ করতে তারা উকিল নোটিশ দিয়ে আমার কাজে বাঁধা প্রদান করছেন। হয়রানিমূলক মামলা করেছেন এবং আরও মামলার পায়তারা চালাচ্ছেন।
তিনি বলেন, তৎকালীন বিএনপি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন সুরক্ষায় একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল, যার মূল শর্ত ছিল- বরাদ্দ প্রাপ্ত ফ্লাট ১০ বছরের মধ্যে বিক্রি নিষিদ্ধ এবং পরে বিক্রি করতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। বাস্তবে এই নীতিমালার প্রতিটি ধারা পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে।
উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে জোরালো দাবি জানিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, বিজয় রাকিন সিটি প্রকল্পের সব বরাদ্দ ও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অমুক্তিযোদ্ধা ও অবৈধ বরাদ্দ বাতিল, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায্য ফ্ল্যাট বরাদ্দ; অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.