মে দিবস, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। প্রতি বছর ১ মে এ দিনটি এলেই শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে এই দিবসটি আজকের শিক্ষার্থীদের কাছে কী অর্থ বহন করে? তারা শ্রমকে কীভাবে দেখে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে তাদের ভাবনা কী তা জানতেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী বাস্তবতা, স্বপ্ন ও শঙ্কার চিত্র।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মে দিবসকে শুধু একটি ঐতিহাসিক দিবস হিসেবে দেখে না; বরং তারা এটিকে অধিকার সচেতনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের কাছে মে দিবস মানে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সম্মান আদায়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, শুধু শ্রমিকরাই নয় সমাজের প্রতিটি মানুষের শ্রমই সমান গুরুত্বপূর্ণ। হোক তা শারীরিক শ্রম কিংবা মানসিক শ্রম সবকিছুরই মূল্য থাকা উচিত।
শ্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আগের মতো শুধু ‘চাকরি’ নয়, বরং ‘কাজের মূল্য’ এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝতে শিখেছে যে, ছোট-বড় কোনো কাজ নেইপ্রতিটি কাজই সম্মানের। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী পার্ট-টাইম কাজ, ফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও শ্রমের মূল্য উপলব্ধি করছে। এতে করে শ্রমকে তারা আর কেবল কষ্টের বিষয় হিসেবে দেখে না, বরং আত্মনির্ভরতার পথ হিসেবে দেখে।
তবে বাস্তবতা সবসময় এতটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে শঙ্কিত। বেকারত্ব, কম বেতন, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ—এসব বিষয় তাদের উদ্বিগ্ন করে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা মনে করে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক মূল্যায়ন পাওয়া কঠিন। তাই তারা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে, বিকল্প পথ খোঁজার দিকেও ঝুঁকছে।
কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ফয়সাল আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, মে দিবস যা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস নামে পরিচিত, প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এই দিনটি শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মরণে উদযাপিত হয়। এটি শুধু একটি দিবস নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য, শক্তি ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। আমাদের দেশে মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক হলেও বাস্তব প্রেক্ষাপটে দেখা যায় এর ভিন্ন রূপ। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত রাখা, নিরাপদ কর্মপরিবেশের ব্যবস্থা না করা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা প্রয়োগ, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তিনি বলেন, সকল বৈষম্য দূরীকরণের মধ্যে দিয়ে আমরা একসাথ হই, ভেঙ্গে দেই অব্যবস্থাপনার মলাট এবং ফিরিয়ে দেই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী মো: রহিম মিয়া বলেন,মে দিবস মূলত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দিন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বাস্তবতা ভিন্ন। শ্রমিক, দিনমজুর পেশাজীবী মানুষেরা দিনের পর দিন নিজেদের ন্যায্য পারিশ্রমিকের অধিকার থেকে বঞ্চিত। চা শ্রমিক, ইট ভাটার শ্রমিক, বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিক কিছুদিন পরপর মানববন্ধন করে শুধুমাত্র তাদের অধিকার রক্ষার জন্যই। এবারের মে দিবসে আমার প্রত্যাশা, ভালো থাকুক দেশের সকল শ্রমিকযোদ্ধারা, ফিরে আসুক তাদের অধিকার।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ রাইয়ান বলেন, মে দিবস শব্দটা শুনলেই আমাদের সবার মনে চলে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই শ্রমিক আন্দোলনের কথা। যার মাধ্যমে কর্ম ঘন্টাকে কমানো হয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা যদি দেখি যে, শ্রমিক শোষণ এখনো চলমান রয়েছে। এর জন্য দায়ী হলো, আমরা যাদের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বানায় তাদের। দেখা যায় বড় বড় ফ্যাক্টরি আছে, যার মাধ্যমে তারা শ্রমিকদের আরো বেশি শোষণ করে। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। তাই মে দিবসকে শুধু শ্রমিকের দিবস না ভেবে আমাদের সকলের অধিকার আদায় এর দিবস ভাবা উচিত।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বলেন, মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। সমাজের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সাথে যুক্ত শিক্ষক, ডাক্তার, ছাত্র, গৃহিণী সবাই কোনো না কোনো ভাবে শ্রম দেন। আমাদেরকে যেকোনো কাজ সম্মান করা উচিত তা ছোট হোক বা বড় হোক। শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের জন্য কর্তব্য। সামনে যেহেতু মে দিবস আসতেছে এই দিবসটি আমাদের শ্রমকে সম্মান করতে, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করতে এবং একটি ন্যায্য সমাজ গড়ে তুলতে শেখায়।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন হাসান বাপ্পি বলেন, আমার কাছে মে দিবস শুধু একটি দিন নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনের মাধ্যমেই এই দিনের সূচনা হয়েছিল।আমি মনে করি, মে দিবস শুধু শ্রমিকদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, কেউ শারীরিক শ্রম দেন, কেউ মানসিক শ্রম দেন, আবার কেউ জ্ঞান ও সেবার মাধ্যমে শ্রম দিয়ে থাকেন। তাই শ্রমের প্রতি সম্মান দেখানো এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, শ্রমের প্রত্যেক ধরনের কাজকে সমান সম্মানের চোখে দেখা, কোনো কাজকে ছোট বা অবহেলার না ভাবা, এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত সমাজ গঠনের জন্য শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলেই মে দিবসের প্রকৃত চাওয়া ঐক্য, সচেতনতা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে। তাই এই দিনের চেতনাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে ধারণ করতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মালিক সরকার বলেন, মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানজনক জীবনের দাবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমার মতে শ্রমিকদের জন্য যখন ন্যায্য মজুরি নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সহনীয় কর্মঘণ্টা মালিক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারবে তখন তাদের আর আলাদা করে সম্মান দিতে হবে না কারণ এসব নিশ্চিত হলেই তারা সম্মানিত হবে। আর সেটাই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে শিকাগোর হার্ভেস্টিং মেশিন কোম্পানি,যার প্রেক্ষিতে পহেলা মে আন্দোলন হয়। এটা তো নিছক কোন আন্দোলন ছিল না এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায্যতার পক্ষে আন্দোলন ছিল।
তিনি আরও বলেন, মে দিবস শুধু শ্রমিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং আমাদের মত সচেতন শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ । এটি শ্রমিকদের সংগ্রাম ও অর্জনের প্রতীক। আমাদের সমাজে প্রতিটি মানুষ কোন না কোনভাবে শ্রমের সাথে যুক্ত। একজন শ্রমিক যেন তার পেশা নিয়ে সমাজে গর্বের সহিত মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে এটার নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.