
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিধি কতটা থাকবে, তা নির্ধারণে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সার্বভৌম দায়িত্ব মূলত কংগ্রেসের ওপর ন্যস্ত। কংগ্রেস দুটি পৃথক কক্ষে বিভক্ত—নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেট। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ কোটির বেশি নিবন্ধিত ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এবং নির্ধারণ করবেন কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ কার পক্ষে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এই নির্বাচন হচ্ছে। নতুন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেবেন। প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী গ্রাহাম প্ল্যাটনার জুলাইয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার পর জ্যাকসন এই লড়াইয়ে এসেছেন। জ্বালানির দাম, আবাসন ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছে পরিবারগুলোর বাজেট। সরকারি তথ্য সংকলনকারী নির্দলীয় সংস্থা ইউএসএফ্যাক্টসের হিসাবে, দেশটির ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি বাসিন্দাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত। অঙ্গরাজ্যটিতে ভোটার ২ কোটি ৩২ লাখ। এরপর টেক্সাসে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং ফ্লোরিডায় ১ কোটি ৩৬ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। অন্যদিকে ওয়াইওমিংয়ে নিবন্ধিত ভোটার ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৬৮, ভারমন্টে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৫ এবং আলাস্কায় ৬ লাখ ৩ হাজার ৩১০ জন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করছেন ৪৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করছেন ৫ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। অন্যদিকে নারী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৪৫ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৩১ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সিনেটের সাধারণ নির্বাচনের আসন ৩৩টির বাইরে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে নতুন গভর্নর নির্বাচনের ভোট নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি ভোটাররা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় আইনসভা, গণভোট এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণী প্রস্তাবের ওপর সরাসরি মতামত প্রদান করবেন। প্রজনন অধিকার, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থাও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে থাকে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালযের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক টড বেল্টের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬.৫টি আসন হারায়। ঐতিহাসিক এই ট্রেন্ড বর্তমান রিপাবলিকান প্রশাসনের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
জর্জিয়া ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালযের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক নাদিয়া ব্রাউন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এই নির্বাচনের প্রভাব তুলে ধরে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন সাধারণ মানুষের সার্বিক মনোযোগ পেলেও মার্কিন নাগরিকেরা মূলত প্রতিদিন স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। ফলে ব্যালটে থাকা স্থানীয় প্রস্তাবনা ও সিদ্ধান্ত জনগণের জীবনের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ সদস্যের প্রত্যেকে নিজ নিজ নির্দিষ্ট একক একটি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাঁদের মেয়াদ থাকে দুই বছর। তাই প্রতি দুই বছর পর পুরো প্রতিনিধি পরিষদ নতুন করে নির্বাচিত হয়। প্রতি ১০ বছর পরপর জাতীয় জনশুমারির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী আসন বণ্টন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সবচেয়ে জনবহুল ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের আসন সংখ্যা ৫২টি, যেখানে ওয়াইওমিং ও ভারমন্টের মতো কম জনসংখ্যার এলাকায় আসন মাত্র একটি। এর ১০০ সদস্যের প্রত্যেক অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে নির্বাচিত হন। নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যায় এগিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ও প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পদসহ আইন প্রণয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে যেকোনো একটি রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম ২১৮টি আসন প্রয়োজন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে টেক্সাস ও কানসাসের আসনগুলো নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের আগ্রহ বেড়েছে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ২১৪টি আসন এবং ১ জন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের পক্ষে অবস্থান করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার অল্প কয়েকটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনই পুরো ক্ষমতার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। টড বেল্টের ধারণা, ডেমোক্র্যাটরা তাদের কৌশলগত লড়াইয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫টির মতো আসন জয় করতে পারে, তবে নতুন করে নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের সুবাদে রিপাবলিকানরাও অতিরিক্ত কিছু সুবিধা পেতে পারে। তার অনুমান, ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৫টি আসন বাড়াতে পারে।
উচ্চকক্ষ সিনেট যুক্তরাষ্ট্রে নীতি প্রণয়ন ও বিচারিক নিয়োগ অনুমোদনে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। সিনেটের মোট আসন ১০০টি, যেখানে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমান দুজন করে প্রতিনিধি থাকেন। অঙ্গরাজ্যের মোট জনসংখ্যা যা-ই হোক না কেন, তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসন দুটিই থাকে। এ কারণে আলাস্কা বা ওয়াইওমিংয়ের সমান ক্ষমতা রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বিশাল অঙ্গরাজ্যের সাথে। বিচার বিভাগের কেন্দ্রীয় বিচারকেরা আজীবন মেয়াদে মনোনীত ও নিযুক্ত হন, এবং তাঁদের চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে।
চলতি মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাওয়া ৩৫টি সিনেট আসনের মধ্যে ২২টি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে অন্তত ৪টি আসনে নিট জয় নিশ্চিত করে ৫১টি আসনে পৌঁছাতে হবে। অপর দিকে, রিপাবলিকানরা ৫০টি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হলেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। কারণ সিনেটে দুই দলের আসন যদি সমান ৫০-৫০ হয়, তবে সিদ্ধান্তমূলক টাইব্রেকার ভোট দেওয়ার একক সাংবিধানিক ক্ষমতা পান ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সদস্য ৫৩ জন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা জোটের মোট সদস্য ৪৭ জন।
সিনেটে বেশ কয়েকটি আসনের ওপর পুরো দেশের রাজনৈতিক মহল নজর রাখছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের সাথে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান মাইক কলিন্স। একই সাথে মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের বিপরীতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্যারা নাথান কঠিন লড়াই ছুড়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া ওহাইও, আলাস্কা, আইওয়া, টেক্সাস এবং ফ্লোরিডার লড়াই সামগ্রিক ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে। নিউ হ্যাম্পশায়ারে শূন্য আসনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস ও রিপাবলিকান জন সুনুনু।
৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে ভোটকেন্দ্র বন্ধের সাথে সাথে প্রথম ধাপের ফল আসতে শুরু করবে, যা গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী রাত ১১টা। জর্জিয়ার নিয়ম অনুযায়ী সিনেট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০ শতাংশের বেশি ভোট) না পান, তবে ১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতির বাস্তবায়ন থমকে যাবে। আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে অধ্যাপক বেল্ট উল্লেখ করেছেন, একটি কক্ষেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল পাস রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রমে কঠোর তদারকি শুরু হবে। সংক্ষেপে, ৩ নভেম্বরের এই ভোটই চূড়ান্ত করবে আগামী দিনগুলোতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কতটা অটুট থাকবে। কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের প্রশাসনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর সুযোগ পাবে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.