শুরু হয়ে গেছে এল নিনো। জলবায়ুজনিত এই ঘটনা এবার এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘সুপার এল নিনো’। ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটতে পারে। গরমের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি বন্যা, খরা ও ঝড়-বৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) নতুন এক প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি জলবায়ুজনিত ঘটনা। এল নিনো ও লা নিনা পর্যায়ক্রমে আসে। এল নিনোয় সমুদ্রপৃষ্ঠ উষ্ণ হয় আর লা নিনায় হয় শীতল। এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে বাতাসের গতিপ্রকৃতি বদলে যায় এবং সাগরের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এসব পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় পরিবর্তন ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, এবারের এল নিনোর সুপার এল নিনো হয়ে ওঠার ঝুঁকি ৬৩ শতাংশ। এমনটা হলে এটি হবে ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে বড় এল নিনো। এবারের এল নিনো শরৎকাল, এমনকি শীত পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শীতকালেও থাকতে পারে গরমের অনুভূতি।
সুপার এল নিনোর ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অংশে সাগরের পানির গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির বেশি হয়। কম্পিউটার মডেলে ডেটা ইনপুট করে এনওএএ যে ফলাফল পেয়েছে, তাতে এই গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির বেশ ওপরে থাকবে বলেই পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।
এনওএএ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গত কয়েক মাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ পানির প্রবাহ বেড়েছে। ফলে বাতাসের গতিপ্রবাহ এরই মধ্যে বদলে গেছে। এই উষ্ণ পানি মহাসাগরপৃষ্ঠের ৬০০ ফুট থেকে এক হাজার ফুট নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং হাজার মাইল পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি এরই মধ্যে সাগরপৃষ্ঠে উঠে আসতে শুরু করেছে। আগের তীব্র এল নিনোগুলোর সময়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
সুপার এল নিনো আবহাওয়ার বিরল ঘটনা। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এর আগে বিশ্ব সর্বশেষ সুপার এল নিনো দেখেছে ২০১৫-১৬ সালে। তার আগে ১৯৯৭-৯৮ ও ১৯৮২-৮৩ সালে।
এল নিনো সাগর থেকে বাতাসে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। ফলে বৈশ্বিক জলবায়ুতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রবণতা বেগবান হয়। এবার আবহাওয়ার যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে ২০২৭ সাল বিশ্বের উষ্ণতম বছর হওয়ার নতুন রেকর্ড গড়তে চলেছে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন। এর আগে উষ্ণতম বছরের রেকর্ড হয়েছে ২০২৪ সালে।
এল নিনো জনজীবনে যেভাবে প্রভাব ফেলবে
এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে আবহাওয়া অস্থির হয়ে ওঠে। তাপপ্রবাহের মাত্রা ও তীব্রতা বাড়ে, কোনো অঞ্চল ঘন ঘন বন্যাকবলিত হয়, আবার কোথায় খরা দেখা দেয়। বেড়ে যায় ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাড়ে এগুলোর তীব্রতাও।
গবেষকেরা বলছেন, এবারের এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে হারিকেনের মাত্রা আগের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও হাওয়াইয়ে ঘন ঘন হারিকেন আঘাত হানতে পারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এবার শীত মৌসুমে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি থাকতে পারে। অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোয় খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবারের বর্ষায় বৃষ্টি কম হতে পারে। এশিয়ার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে শীতকালে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে দেখা দিতে পারে খরা। আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও খরা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বেড়ে যেতে পারে বৃষ্টি। ফলে এসব অঞ্চলে বন্যা হতে পারে। তবে ব্রাজিলে গরম তীব্র হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো কখনোই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে না। জলবায়ুজনিত এই ঘটনা প্রতিবারই এমন কিছু নিয়ে আসে, যা সবাইকে চমকে দেয়। এবার চমক হিসেবে কী দুর্যোগ ডেকে আনবে এল নিনো, তা এখনই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার না কমায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি আগের তুলনায় এখন বেশি। এর মধ্যে সুপার এল নিনো যে বড় দুর্যোগ ডেকে আনবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, এমন উষ্ণ সময়ে এর আগে কখনো সুপার এল নিনো আসেনি।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.