ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত দুর্গম চর। চারদিকে পানি, যাতায়াতেও নানা দুর্ভোগ। এমন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর ঝুনকার চরের শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অথচ সেই বিদ্যালয়েই দিনের পর দিন চলছে শিক্ষকদের অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ। কখনো শিক্ষক নেই, কখনো শ্রেণিকক্ষে ঝুলছে তালা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান।
সোমবার (১৭ আগস্ট) অনিয়মের চিত্র যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। দিনভর বিদ্যালয়টি ছিল তালাবদ্ধ। খোলা হয়নি কোনো শ্রেণিকক্ষের তালা, উত্তোলন করা হয়নি জাতীয় পতাকাও। অথচ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়ার কথা দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা।
পরীক্ষার আগের দিন সকালে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে হাজির হয় শিক্ষার্থীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে অপেক্ষা করেও কোনো শিক্ষকের দেখা পায়নি তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শিশুদের ক্ষোভ। একপর্যায়ে তালাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষের দরজা খোলার চেষ্টা করে তারা। চিৎকার করে প্রতিবাদ জানায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
চরের বুকে শিশুদের এমন বিক্ষোভের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যেও। বিদ্যালয় তালাবদ্ধ থাকায় সরকার নির্ধারিত ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচির খাদ্যসামগ্রী থেকেও বঞ্চিত হয় শিক্ষার্থীরা।
পাঁচ শিক্ষক, তবুও শিক্ষক নেই
বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৮০ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের পাঠদানের জন্য কর্মরত রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক। কিন্তু অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। নিজেদের সুবিধামতো দিন ভাগ করে সপ্তাহে দু-একদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন তারা।
অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, পাঁচ শিক্ষকের মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষককে বিদ্যালয়ে প্রায় দেখাই যায় না। এমনকি বিদ্যালয়ে নিয়মিত হাজিরা খাতাও সংরক্ষণ করা হয় না। শিক্ষকদের এমন অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম।
চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ভাষ্য, দুর্গম এলাকায় অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পাঠানোর সুযোগও সীমিত। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত না এলে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
পরীক্ষার আগের দিনও বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, মঙ্গলবার থেকে তাদের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। পরীক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিতে তারা সকালে বিদ্যালয়ে আসে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো শিক্ষককে পায়নি তারা।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ‘পরীক্ষা সামনে, কিন্তু স্কুলে কোনো শিক্ষক নেই। আমরা কীভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেব, সেটিও বুঝতে পারছি না।’
প্রধান শিক্ষক অবসরের পর অবনতি
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, ২০১৬ সালে বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে শুরু করে।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
আল-আমিনের দাবি, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে তদন্তে এসে অভিযোগের সত্যতা পান। এরপরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব মিলেছে সরকারি নথিতেও
বাংলাদেশ স্কাউটসের অনলাইন ডিরেক্টরিতেও ‘খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে বিদ্যালয়টির কাব স্কাউট গ্রুপের তথ্য রয়েছে। একই ডিরেক্টরিতে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকাও রয়েছে।
এ ছাড়া কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চর ও খেওয়ার আলগার চর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার দুর্গম চরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত—বিভিন্ন সময়ে বন্যার খবরেও এ এলাকার উল্লেখ পাওয়া গেছে।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইশরাত জাহানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হচ্ছে শোকজ, কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলী বলেন, ‘সোমবার কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না—এটি সত্য। দায়িত্বে অবহেলার কারণে সব শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জোরালো সুপারিশ করা হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ঘটনা জানার পরপরই অভিযুক্ত শিক্ষকদের শোকজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অর্ণপূর্ণা দেবনাথ বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত শিক্ষকদের শোকজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু ওই বিদ্যালয় নয়, জেলার কোথাও এমন অনিয়ম হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে সব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুর্গম চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, সেই বিদ্যালয়েই যদি দিনের পর দিন ঝুলে থাকে তালা, শিক্ষক না থাকেন—তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই শিশুদের শিক্ষার দায় নেবে
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.