রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের মসজিদে সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত ইমামের বিরুদ্ধে অশুদ্ধ তিলাওয়াত, মাসআলা সংক্রান্ত ভুল, বেশি ছুটি কাটানো, অসময়ে আজান দেওয়া সহ রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। বিষয়টি কেন্দ্র করে হল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভিন্ন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগে অস্বচ্ছতা, প্রার্থীর যোগ্যতা এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তারা।
জানা যায়, প্রায় ৮ শতাধিক শিক্ষার্থীর আবাসিক হলটিতে দীর্ঘদিন স্থায়ী ইমাম না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদেরাই শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতে পারদর্শীদের নিয়ে প্রায় ১বছর নিয়মিত ইমামতির দায়িত্ব পালন করাতেন। পরবর্তীতে হল মসজিদে স্থায়ী ইমাম নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হলে শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেন।
এ বিষয়ে এমটিই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সাজিদ জানান,"হল প্রশাসন তখন জানায়, হলের ফান্ডে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের ফি অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রশাসনিক অনুমোদন ব্যতীত এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না। তারই প্রেক্ষিতে আমরা ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার বরাবর ইমাম নিয়োগে লিখিত আবেদন করি। এতে কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক ভাবে জানায়, রুয়েটে কেন্দ্রীয় মসজিদ থাকায় হল ভিত্তিক পৃথক ইমামের প্রয়োজন নেই। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন তারা।"
এরপরও ২-৩ মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসহ পৃথক আবেদন দেওয়া হয়। সেখানে প্রস্তাব করা হয়, শিক্ষার্থীদের থেকে মাসে ৫০-১০০ টাকা সংগ্রহ করে ইমামের ব্যয় বহন করা হোক। পাশপাশি ইমামের আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অনুরোধও করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে রুয়েট প্রশাসন তিনজন ইমাম ও দুইজন মুয়াজ্জিন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রায় ৪০০ আবেদনকারীর মধ্য থেকে ৩০০ জনকে পরীক্ষা বা ভাইভার জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। তবে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পরীক্ষার আগেই হঠাৎ হল মসজিদে নতুন একজন কে ইমামের দায়িত্ব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ জানান শিক্ষার্থীরা।
এবিষয়ে হল প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলে শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, নিয়োগের বিষয়টি তাদের পূর্বে জানানো হয়নি। ওপরের নির্দেশে ঐ ইমামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তার বেতন ও আবাসন ব্যয় হলের ফান্ড থেকে বহনের নির্দেশনা রয়েছে। এতে নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কীভাবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো—প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের।
উল্লেখ্য দায়িত্ব গ্রহণের পর ঐ ইমামের কিরাত, তাজবিদ ও নামাজ-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মাসআলায় ভুল পরিলক্ষিত করে হল শিক্ষার্থীরা। এতে আপত্তি ওঠায়, হল প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাজশাহী নগরীর তালিমুদ্দীন একাডেমির দুই শিক্ষকের মাধ্যমে তার মান যাচাই করা হয় বলে জানা যায়।
কিন্ত মান যাচাইকরণের নথি অনুযায়ী, ১০০ নম্বরের মূল্যায়নে ঐ ইমাম মাত্র ৩১ নম্বর পেয়েছেন। এর মধ্যে কিরাতে ২৫ নম্বরে ১০, তাজবিদে ২৫ নম্বরে ৫ এবং মাসআলায় ৫০ নম্বরে ১৬ নম্বর পেয়েছেন। মূল্যায়নের প্রিন্ট ও সফট কপি প্রশাসনের কাছে ইতিমধ্যেই জমা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, যেখানে প্রায় ৩০০ প্রার্থীকে পরীক্ষা বা ভাইবারের জন্য বাছাই করা হয়, আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার আগেই কী প্রক্রিয়ায় ইমাম নিয়োগ দেওয়া হলো? এদিকে তার মূল্যায়নে ফলাফলে পরিলক্ষিত হলে, নিয়োগ পূর্ববর্তী যাচাই-বাছাই নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম শিক্ষার্থীরা। বর্তমান ইমামের ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল-তা প্রশাসনকে স্পষ্ট করার দাবি তাদের।
নিয়োগ বিষয় এবং হলের অন্যান্য অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে শিক্ষার্থীরা টানা ২দিন উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও ২য় দিন মেলেনি অনুমতি। এ বিষয়ে পুরকৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মুস্তাফিজ বলেন, "আমারা ইমাম সাহেবের ভুলসমূহ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে গত ৫-৬ মাসে ২বার উপাচার্যের কাছে, ২বার ছাত্রকল্যাণ দপ্তরে এবং ৫-৬ বার হল প্রভোস্ট এর কাছে গিয়েছি; ইমাম সাহেবের সাথে বসেছি, ছাত্রদের মতামত নিয়েছি; এসবের পিছনে আমাদের সম্মিলিতভাবে ১০০০ নিরেট ঘন্টার বেশি সময় অপচয় হয়েছে।"
অন্যদিকে ঐ ইমামের দায়িত্ব পালনে অসঙ্গতিতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে তিনি নিয়মিত আজান না দিয়ে শুধু নামাজের সময় আসতেন। ফলে বিভিন্ন ওয়াক্তে শিক্ষার্থীদেরই আজান দিতে হয়। কোনো ওয়াক্তে পূর্বঘোষণা ছাড়াই অনুপস্থিতি এবং সপ্তাহের শুক্র-শনি ২ দিন ছুটি কাটানোর বিষয়টিও জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইকবাল জানান,"এসব ছুটিতে প্রক্সি ইমাম হিসেবে একজন হল শিক্ষার্থীর নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে হল প্রশাসন কে আবেদন করতেন। প্রথম সপ্তাহে ঐ শিক্ষার্থীর সম্মতি নিলেও পরবর্তী সপ্তাহ গুলোতে তাঁর অজ্ঞাতসারেই নাম ও রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন ইমাম সাহেব।"
আবাসন ও খাবার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে হল শিক্ষার্থী সাজিদ জানান, ইমামের দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তার ছেলে সহ হলে কক্ষ বরাদ্দ এবং হল ডাইনিংয়ে বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্ত যখন শিক্ষার্থীদের পৃথক অর্থায়নে ইমামের ব্যয় বহনের প্রস্তাব ও কেবল কক্ষের ব্যবস্থার অনুরোধ জানানো হয়, তখন সে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। অথচ পরবর্তীতে অস্বচ্ছতা প্রক্রিয়ায় নিয়োগ প্রাপ্ত ইমামের জন্য আবাসন ও খাবার উভয়ই ব্যবস্থাই কী প্রক্রিয়ায় করা হলো—এ নিয়ে প্রশাসনের ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়।
এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইমাম নিয়োগে হেফজ ও কারীয়ানা কোর্সের সনদ জমা এবং তার যোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান হলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান মুসলিম শিক্ষার্থীরা। তখন ঐ ব্যক্তি কারীয়ানা কোর্স করতে হল প্রশাসনের কাছে প্রায় এক মাসের ছুটির আবেদন করেন বলে জানা যায়। অর্থাৎ তার নিয়োগে যোগ্যতা ও সনদ যাচাই না করার, প্রসঙ্গে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আল-আমিন-আল-আজাদুল ইসলাম জানান, যে ব্যক্তিকে ইমামের দায়িত্বে রাখা হয়েছিল তিনি এখন হল মসজিদে নেই। এছাড়াও উক্ত ব্যক্তিকে ইমামতির জন্য না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, নিয়োগে যথাযথ প্রক্রিয়া, যোগ্যতা যাচাই, দায়িত্ব পালনে অসঙ্গতি এবং ইমামের সুবিধা প্রদানের বিষয়গুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হোক। একই সঙ্গে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামনের স্থায়ী ইমাম স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যাক্তিকে প্রত্যাশা করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এইচএসডিএফ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এস এম ইমন, আইন উপদেষ্টা : অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবু হানিফ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
মোবাইল নাম্বার -০১৬১০৫১৭৭০৩, Mail-ajkerkagojbd22@gmail.com
ঠিকানা: বাড়ি ১৮, রোড ০১, সেকশন ০৮, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2026 আজকের কাগজ. All rights reserved.