
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সাবেক ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়া। একসময় যেখানে রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, ছিল না নাগরিক পরিচয়, ভোটাধিকার কিংবা প্রশাসনের ছোঁয়া। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, সড়ক—সবকিছু থেকেই বঞ্চিত ছিলেন এখানকার মানুষ। অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া সেই জনপদ আজ বদলে গেছে অনেকটাই। নাগরিকত্বের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে ঘরে ঘরে। তবে ছিটমহল বিনিময়ের এক যুগে পদার্পণের দিনে এলাকাবাসীর একটাই আক্ষেপ—এখনো পৃথক ইউনিয়নের স্বীকৃতি মেলেনি।
আজ ৩১ জুলাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। ২০১৫ সালের এই দিনে মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ ৬৮ বছরের ছিটমহল সমস্যার অবসান ঘটে। ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি—মোট ১৬২টি ছিটমহল নিজ নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়। স্বাধীনতার স্বাদ পান অর্ধলক্ষাধিক মানুষ, যাদের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে রাষ্ট্রহীনতা, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার মধ্যে।
রাষ্ট্রহীনতা থেকে নাগরিকত্বের আলো
এক সময় দাসিয়ারছড়ায় কোনো সরকারি স্কুল ছিল না। ছিল না হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, আইন-শৃঙ্খলা কিংবা জনপ্রতিনিধির কার্যক্রম। অপরাধ, মাদক বাণিজ্য ও চোরাচালানের জন্য পরিচিত ছিল এলাকাটি। কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পেতেন না। সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ছিল দুর্বিষহ।
ছিটমহল বিনিময়ের পর বদলে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট। নির্মিত হয়েছে নতুন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও শ্মশানঘাট। বিদ্যুৎ পৌঁছেছে ঘরে ঘরে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ভোটাধিকারসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা এখন তাদের নাগালে। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও আসতে শুরু করেছেন বাসিন্দারা।
তবু অপূর্ণ রয়ে গেছে সবচেয়ে বড় দাবি
দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা মনির হোসেন, শরিফুল ইসলাম, রিমা খাতুন ও আকবর আলী বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিক হয়েছি, অনেক উন্নয়নও হয়েছে। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি—দাসিয়ারছড়াকে একটি পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক। তাহলে সরকারি সেবা আরও সহজ ও দ্রুত পাব।”
তাদের অভিযোগ, পৃথক ইউনিয়ন না থাকায় প্রশাসনিক সেবা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নিতে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।
‘৬৮ বছরের স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ’
সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের নেতা আলতাফ হোসেন বলেন, “দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা অনেক উন্নয়ন পেয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল একটি ইউনিয়ন। আগের সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। নতুন সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—দাসিয়ারছড়াকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঘোষণা করা এবং অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ শেষ করা।”
তিনি আরও জানান, এলাকায় একটি আইসিটি সেন্টার থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি কার্যকর নয়।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা আক্তার বলেন, “সরকারের কোনো নির্দেশনা না থাকায় ডি-সেট সেন্টারের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ইউনিয়নের দাবিতে এখনো কোনো লিখিত আবেদন পাইনি। আবেদন পেলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, সাবেক ছিটমহল এলাকার মানুষের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় ছিটমহল বিনিময়
বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহল সমস্যার ইতিহাস প্রায় সাত দশকের। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নূন চুক্তি, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি এবং ২০১১ সালের সমঝোতা নানা রাজনৈতিক জটিলতায় বাস্তবায়িত হতে পারেনি। অবশেষে ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুমোদন হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয় ছিটমহল বিনিময়।
এর মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের সঙ্গে এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত হয়। দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীন জীবনের অবসান ঘটে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের।
এক যুগের পদার্পণে উৎসবের আমেজ
ছিটমহল বিনিময়ের ১১ বছর পূর্তি ও এক যুগে পদার্পণ উপলক্ষে দাসিয়ারছড়া ও কালীরহাটসহ আশপাশের এলাকায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কেক কাটা, আলোকসজ্জা, প্রদীপ প্রজ্বলন এবং শহীদদের স্মরণে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এটি শুধু একটি উৎসব নয়; এটি নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দিন, স্বাধীনতার দিন, আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার দিন।”
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
দাসিয়ারছড়াবাসীর প্রত্যাশা, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, কৃষিভিত্তিক শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এলাকাকে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে। বিশেষ করে দাসিয়ারছড়াকে পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণা করে দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন চান তারা।
এক যুগ আগে নাগরিকত্বের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। এখন দাসিয়ারছড়ার মানুষের অপেক্ষা—পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক স্বীকৃতির। স্বাধীনতার আনন্দকে পরিপূর্ণ করতে সেই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড় দাবি।