
পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি, জরা ও গ্লানিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পার্বত্য জনপদ। সেই আবহেই রোববার ভোরে রাঙ্গামাটিতে উদযাপিত হয়েছে চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘ফুল বিজু’, যা পার্বত্য অঞ্চলের সর্ববৃহৎ সামাজিক উৎসব বৈসাবির প্রথম দিন। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়, হ্রদ আর জনপদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
উৎসবের এই রঙিন আবহে এখন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত পুরো রাঙ্গামাটি।
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই নানা বয়সী মানুষ ভিড় করেন কাপ্তাই হ্রদ-এর পাড়ে। শহরের কেরাণীপাহাড়, রাজবাড়ি ঘাট, গর্জনতলীসহ বিভিন্ন ঘাটে দেখা যায় মানুষের ঢল। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত পাহাড়ি নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা বন থেকে সংগৃহীত বুনো ফুল ও নিমপাতা নিয়ে সমবেত হন। পরে কলাপাতায় সাজানো ফুল হ্রদের জলে ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন করেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, এই ফুল ভাসানোর আচার কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রকৃতি, জল ও জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, বছরের শেষ প্রহরে পবিত্র জলে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট, অশুভ ও অকল্যাণ দূর হয়ে যায় এবং নতুন বছরের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুস্থতার দ্বার উন্মুক্ত হয়। অনেকে আবার এটিকে ‘ফুল নিবেদন’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
সার্বিকভাবে দিনটি ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং দরজায় ফুল ও নিমপাতা টাঙানোর মধ্য দিয়েও উদযাপিত হয়। এই রীতি অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ফলে ফুল বিজু শুধু হ্রদকেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠান নয়, বরং ঘরে ঘরে একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অনুশীলন হিসেবেও প্রতিফলিত হয়।
উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ি জনপদে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য মিলনমেলার পরিবেশ। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নাম ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সময়কে উদযাপন করেন। চাকমাদের কাছে এটি ‘বিজু’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসুক’, মারমাদের কাছে ‘সাংগ্রাই’ নামে পরিচিত হলেও সম্মিলিতভাবে এই উৎসব পরিচিত বৈসাবি উৎসব নামে। ভিন্নতা সত্ত্বেও সবার আবেগ ও প্রত্যাশা এক হয়ে মিশে যায় একই স্রোতে—শান্তি ও সম্প্রীতির প্রত্যাশায়।
উৎসবের আয়োজকদের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়োজন এখন আর কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। সব সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে অংশগ্রহণ করে এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছেন।
ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসব আগামীকাল সোমবার ‘মূল বিজু’ উদযাপনের মাধ্যমে আরও বর্ণিল রূপ নেবে। এদিন ঘরে ঘরে রান্না করা হবে ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’—বিভিন্ন ধরনের সবজির সমন্বয়ে তৈরি বিশেষ খাবার, যা আতিথেয়তার প্রধান অনুষঙ্গ। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অতিথিদের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে দিনটি কাটে আনন্দ-উল্লাসে।
এরপর মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে শেষ হবে এই তিন দিনের উৎসব। নববর্ষের দিন ধর্মীয় প্রার্থনা, মন্দির পরিদর্শন এবং গুরুজনদের আশীর্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেবেন পাহাড়ের মানুষ।
সব মিলিয়ে ফুল বিজুর স্নিগ্ধ সূচনা আর কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসমান ফুলের মৃদু ঢেউ যেন নতুন দিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
Leave a Reply