1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
“টাউটে গ্রাম, সালিশে ন্যায়-তবে কোন পথে?” - আজকের কাগজ
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন

“টাউটে গ্রাম, সালিশে ন্যায়-তবে কোন পথে?”

মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ জুন, ২০২৫ ৪:৪২ পিএম
শেয়ার করুন

টাউটে গ্রামীণ জীবন, সালিশে ন্যায় আজ যেন অনুপস্থিত। এই প্রতারণার গ্রাসে গ্রামের লোকেরা কীভাবে প্রতিকার চাইছে? ‘তবে কোন পথে?’—চলুন খুঁটিনাটি খুঁজে দেখা যাক।”

গ্রামীণ বাংলাদেশের সালিশ ব্যবস্থা বহু প্রজন্ম ধরে ছিল এক আত্মনির্ভর, দক্ষ ও সহজগম্য সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যম। এটি ছিল গ্রামের আর্থ-সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার একটি অঙ্গ; কিন্তু সময়ের সাথে‑সাথে এর কাঠামো, নীতি এবং স্বচ্ছতা নানা কারণে ওলটপালট হয়েছে।
টাউট” শব্দটি ইংরেজি “tout” থেকে আগত, যার আভিধানিক অর্থ দালাল, মক্কেল সংগ্রাহক বা ভদ্রবেশী প্রতারক  । বাংলাদেশে এই শব্দটি মূলত প্রতারণা, জালিয়াতি ও দালালির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে “দ্য টাউটস অ্যাক্ট” প্রণীত হয়, যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালে হালনাগাদ হয়।  এই আইনে টাউটদের সংজ্ঞা, কার্যক্রম এবং শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাটপার: শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ:
বাটপার শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রতারক, ঠগ, রাহাজানকারী বা লুটেরা অর্থে ব্যবহৃত হয়।  এর উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে।  কেউ কেউ মনে করেন, এটি ইংরেজি “barter” শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিনিময়।  অন্যদিকে, উইকিপিডিয়ার মতে, “বাটপার” হলো সেই ব্যক্তি, যে চোরের চোরাই মাল চুরি করে।
বাংলা অভিধানে “বাটপার” শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে: প্রতারক,ঠক,রাহাজানকারী,লুটেরা
এই শব্দটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সমাজে প্রতারণা বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
“বাটপার” শব্দটি সরাসরি কোনো আইনে সংজ্ঞায়িত না হলেও, এর অন্তর্ভুক্ত কর্মকাণ্ড Penal Code, 1860 এর বিভিন্ন ধারায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।  যেমন:
ধারা ৪১৫: প্রতারণা (Cheating)
ধারা ৪১৭: প্রতারণার জন্য শাস্তি
এছাড়া, চুক্তি আইনের ১৭ ধারায় “fraud” বা জালিয়াতির সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, যা বাটপারদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
টাউট ও বাটপারের উত্থান:
সাম্প্রতিক সময়ে ‘টাউট’ ও ‘বাটপার’ নামে প্রতারক শ্রেণীর প্রভাব সালিশে প্রবেশ করেছে। তারা স্থানীয় অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় জাল দলিল, ভুয়া মামলা, সরকারি সুবিধা আশ্বাস ইত্যাদি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিচার প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে তুলছে। ফলস্বরূপ স্বচ্ছ না-হওয়া, পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত, এবং অনিয়মিত অর্থ লাভ এর মাধ্যমে সালিশ আজ এক দুর্বল, অনিশ্চিত প্রতিষ্ঠান রূপে পরিণত হয়েছে।
সালিশের ক্রমশ অবক্ষয়:
সালিশ আজ কলঙ্কের সম্মুখীন। ব্যাপক তথ্যভাণ্ডার পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত হচ্ছে—দুর্নীতি, পক্ষপাত, স্থানীয় ক্ষমতাধরদের প্রভাব, লিঙ্গ বৈষম্য—এসব কারণে গ্রামে সালিশের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে এসেছে। এখন গ্রামীণ মানুষের অধিকাংশই সালিশকে “নাগরিক ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়” বলে ভাবছে, বরং এটি এক অবাঞ্ছিত ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন ও বাস্তবতার ফাঁক:
বাংলাদেশে টাউটদের বিরুদ্ধে আইনগত কাঠামো রয়েছে – ১৮৭৯ সালের “The Touts Act” থেকে ২০২৪ সালের “টাউট আইন” পর্যন্ত। বাটপারদের কার্যক্রমতো আরও প্রাচীন আইন (Penal Code, ১৮৬০ এর ৪১৫ ও ৪১৭ ধারা) দ্বারা নিষিদ্ধ। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব আইন প্রয়োগে রয়েছে দীর্ঘ ধীরগতি, দুর্বল নজরদারিতা এবং রাজনৈতিক-স্থানীয় শক্তির অস্বীকার, যার ফলে দক্ষ আইননিষ্ঠা বা শাস্তির বাস্তবতা প্রায় দেখা যায় না।
সমাধানের উপায় ও পথপ্রদর্শন:
১. সচেতনতা বৃদ্ধি:
গ্রামীণ জনগণকে প্রতারকদের চিহ্নিত এবং সনাক্ত করার শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা। স্থানীয় এনজিও ও সামাজিক সংগঠন যেমন–Ain o Salish Kendra, MLAA, BLAST, BRAC—দের মাধ্যমে চেতনা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে হবে ।
২. আইন প্রয়োগে কঠোরতা:
আইন প্রয়োগ কেন্দ্র—পুলিশ, থানা, উপজেলা—এই সমস্ত পর্যায়ে টাউট ও বাটপারদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ন্যায়বিচার ব্যাহত হলে নির্দিষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে: প্রশাসনিক নজরদারি রেজিস্ট্রি, থানা, পাসপোর্ট অফিস, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বেপার ট্রানজেকশন ঘাটতিগুলো বন্ধ করতে হবে, পদ্ধতিগত নিরীক্ষা নিশ্চিত করা ও দালালদের প্রবেশ রোধ করতে হবে।
৪. স্থানীয় নেতৃত্বের সদ্যুৎকর ভূমিকা:
গ্রামীন জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী ও ধর্মীয় নেতারা যেন এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। তারা সালিশের প্রবল দায়িত্ববান হেফাজতকারী হিসেবে কাজ করতে পারেন, এবং জায়গায় জায়গায় দান‑দরিদ্রদের জন্য সেবা নিশ্চিত করতে পারে।
৫. সংশোধিত সালিশ কাঠামো:
কেবল সালিশ নয়; ২০০৬ সালের Village Court ও NGO‑সমর্থিত সালিশ মডেল যেমন MLAA‑র “Madaripur Mediation Model”–কে স্থানীয়ভাবে সম্প্রসারিত করে ন্যায়বিচার ব্যবস্থা কর্মক্ষম ও মানবাধিকারমুখী করা যায়  ।
পরিশেষে বলা‌ যায়, গ্রামীণ বাংলাদেশে টাউট ও বাটপারদের কার্যক্রম শুধু আইনগত নয়–এটি সামাজিক অধঃপতনের যে সমস্যা উৎপন্ন করেছে, তা সমগ্র সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে চিহ্নিত করে। একাধিক স্তরে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করা সম্ভব। এজন্য জনগণের সচেতনতা, প্রশাসনের কঠোরতা, স্থানীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব, এবং ন্যায়সঙ্গত সালিশ বিকল্প নিশ্চিত করার থিতু বাস্তবায়ন আবশ্যক।
দেশের জাতীয় উন্নয়নের মুখে দরিদ্র গ্রামীণ ভূমির নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে অন্তত বহুতল উন্নয়ন কাগজে-কলমে থেমে যাবে। তাই আজই সময় – গ্রামীণ সালিশ থেকে বঞ্চিত সুরক্ষাহীন মানুষদের ন্যায়ের পথে ফেরানোর; তাঁদেরকে টাউট ও বাটপারের অদৃশ্য শিকল থেকে মুক্ত করার। এক অভিন্ন সামাজিক চেতনার প্রয়োজনে দাঁড়াতে হবে – কারণ জাতীয় উন্নয়ন একমাত্র তখনই অর্থবহ হয় যখন সবচেয়ে বিপন্ন জনগোষ্ঠীও ন্যায়প্রাপ্তি পায়।

এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *