
ইরান যুদ্ধের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় দেশটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সেই আশঙ্কার কথাই ব্যক্ত করেছেন, যা উত্তপ্ত উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের সাধারণ মানুষ মনে মনে ভয় পাচ্ছিল, ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে? ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শত্রু জনসমক্ষে আলোচনার সংকেত দিচ্ছে, অথচ গোপনে তারা স্থল হামলার ছক কষছে।
তাঁর ধারণা হয়তো ভুল নয়। ওয়াশিংটন এখনও দাবি করে যাচ্ছে যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে। অথচ একই সঙ্গে তারা এই অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছে। যার মধ্যে এশিয়া থেকে আসা ৩,৫০০ সেনাও রয়েছে যারা এই সপ্তাহান্তে একত্রিত হতে শুরু করেছে।অনেকেই ধারণা করছেন, মার্কিন বাহিনী পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রধান তেল টার্মিনাল ‘খার্গ আইল্যান্ড’ দখল করতে পারে। এটি দখল করার অর্থ হলো ইসলামিক রিপাবলিকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া, যাতে তেল রপ্তানি থেকে রেভল্যুশনারি গার্ডের তহবিলে আসা অর্থ বন্ধ হয়ে যায়।
এখনও কোনো পরিকল্পনা জনসমক্ষে আনা হয়নি, তবে মার্কিন বাহিনীকে উপকূলীয় এলাকাগুলো দখলের নির্দেশ দেয়া হতে পারে যাতে সংকীর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়া যায়। ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পথটি বন্ধ করে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।এমনকি ইরানের ভেতরে গভীর সুড়ঙ্গে থাকা পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে রেইড দেওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মরিয়া হয়ে ইরানি সরকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ওই উপাদানগুলো ব্যবহার করতে পারে। তবে ইরানে স্থল সেনা নামানো হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
ওয়াশিংটন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দিলেও, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছড়িয়ে থাকা অপ্রস্তুত মার্কিন সেনাদের জড়ো করা হচ্ছে খুব ধীরগতিতে। কালিবাফ তার বার্তায় সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি বাহিনী ইতিমধ্যেই আমেরিকান সেনা স্থলপথে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে যাতে তাদের ওপর আগুনের বৃষ্টি ঝরানো যায়। আকস্মিকতার সুযোগ ছাড়া, মার্কিন স্থল অভিযানে বিশাল এবং আধুনিক মারণাস্ত্রের দাপট সত্ত্বেও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
এছাড়া প্রতিবেশি দেশগুলোর জন্যও রয়েছে চরম ঝুঁকি। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লোকসান এবং জনশক্তির দেশত্যাগের শিকার হয়েছে। তারা এখন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত। তেহরান ইতিমধ্যেই পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর শাস্তিমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, কারণ এই দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
কালিবাফের ভাষায়, যুদ্ধ তীব্র হলে ইরান তাদের আক্রমণ আরও বাড়াবে এবং আঞ্চলিক সহযোগীদের চিরতরে শাস্তি দেবে। অত্র অঞ্চলের দেশগুলো ভালো করেই জানে যে এর অর্থ হতে পারে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নাজুক জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে কাতারের রাস লাফান গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
যদিও ক্ষয়ক্ষতি ছিল সামান্য, কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তা তীব্র কম্পন সৃষ্টি করেছিল। এ ধরনের আরও হামলা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত তৈরি করবে। মরুপ্রধান উপসাগরীয় দেশগুলো পানীয় জলের জন্য যে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের (লবণাক্ত পানি শোধন কেন্দ্র) ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। যদিও রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) আপাতত এমন ‘অমানবিক’ পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে। গত সপ্তাহে টেলিগ্রামে এক পোস্টে তারা জানায়, লম্পট, সন্ত্রাসী এবং শিশু হত্যাকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, আইআরজিসি অঞ্চলের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা করতে চায়। আইআরজিসি এখন পর্যন্ত এমন কিছু করেনি। শেষ বাক্যটি বেশ অশুভ ইঙ্গিত বহন করে।
নিঃসন্দেহে, আলোচনা বা সমঝোতার পথ না মিললে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি উন্নতির আগে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কিন্তু আলোচনার কথা উঠলে দেখা যায় দুই পক্ষের অবস্থান মেরু সমদূরত্বে।
ওয়াশিংটনের ১৫-দফা পরিকল্পনা অনেকটা ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ করার দলিলের মতো। এতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম এবং হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে, যা তেহরানের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কলিবাফের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এই ১৫ দফার মাধ্যমে তা-ই হাসিল করতে চায় যা তারা যুদ্ধে পারেনি। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরান কোনো অপমান মেনে নেবে না।
অন্যদিকে, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের নিজস্ব ৫ দফা পরিকল্পনাটিও সমানভাবে অবাস্তব। এতে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে এবং এই অঞ্চল থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উভয় পক্ষই এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী হতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সমঝোতার কোনো চিহ্ন নেই, আছে শুধু সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার এবং পাল্টাপাল্টি দাবি।
এই যুদ্ধে ইরান বিধ্বস্ত হচ্ছে: তাদের নেতৃত্ব তছনছ হয়ে গেছে, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় সামরিক শক্তি ক্ষয় হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশার শিকার হচ্ছে। কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিক প্রমাণ করেছে তারা সহজে ভেঙে পড়ার মতো নয়। ট্রাম্প প্রশাসন যেটিকে খুব সহজ সামরিক অভিযান হিসেবে ভেবেছিল, তেহরান তাদের হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে তা জটিল করে তুলেছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সম্পৃক্ততা, ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের পথ বন্ধ করার হুমকি, পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় মাসে পা রাখা এই যুদ্ধে দ্রুত জয়ের যে আশা ওয়াশিংটন করেছিল, তা এখন সুদূর পরাহত মনে হচ্ছে।
Leave a Reply