
মহানবী (সা.) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শের নজির স্থাপন করেছেন। জীবিকা উপার্জনের উপায় হিসেবে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মহানবী (সা.) পথ-প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। ৪০ বছর বয়সে নবী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করার আগেও তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। মহানবী (সা.) ব্যবসায়ের কাজে বিভিন্ন সময় সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, বাহরাইন, ইথিওপিয়াসহ আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন।
কখনো আরবের ব্যবসায়ী কাফেলার সঙ্গী হয়ে, আবার কখনো চাচা আবু তালিবের ব্যবসায়ের কাজের সঙ্গী হিসেবে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি একজন সফল এবং আদর্শ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সফলতার কথা দ্রুত মক্কার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন মক্কায় সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী ছিলেন খাদিজাতুল কোবরা (রা)। তিনি একসময় তাঁর বিশাল ব্যবসায় তদারকি করার জন্য একজন সৎ ও যোগ্য লোকের সন্ধান করছিলেন। তখন মুহাম্মাদ (সা.)-এর সুনামের কথা তাঁর কানে এলো। এরপর খাদিজা (রা.) ব্যবসায়ের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন মহানবী (সা.)-এর ওপর। মহানবী (সা.) অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে খাদিজা (রা)-এর ব্যবসায় পরিচালনা করেন এবং এতে খাদিজা (রা.) অভাবনীয় সফলতা লাভ করেন।
মহানবী (সা.)-এর আদর্শ সাহাবিরা গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছিলেন। তাই দেখা যায়, সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই সুবিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও সুদক্ষ কারিগর ছিলেন। আবু বকর (রা.) নিজেই বড় মাপের ব্যবসায়ী ছিলেন। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি নিয়মিত বাজারে যাতায়াত করতেন। উমর (রা.) এবং উসমান (রা.)ও ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। মুহাজিরগণের মধ্যে অনেকেই ব্যবসায়ী ছিলেন। আমাদের পূর্বসূরি মহামতি ইমামরাও ব্যবসায় করতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালেক ইবন আনাস (রহ.), ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.), আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) প্রমুখ। তাঁরা নবীজি (সা.)-এর আদর্শের আলোকে বড় মাপের ব্যবসায়ী হতে পেরেছিলেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের গুরুত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা দেখতে পাও, নদী-সমুদ্রে নৌকা-জাহাজ পানির বক্ষ দীর্ণ করে চলাচল করছে, যেন তোমরা তার অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধান করতে পারো। ’ (সুরা আল ফাতির, আয়াত : ১২)
আল্লাহ আরো বলেন, ‘এমন বহু লোক রয়েছে, ব্যবসায় ও কেনাবেচা যাদের আল্লাহর স্মরণ, সালাত কায়েম ও জাকাত আদায় থেকে বিরত রাখতে পারে না। ’ (সুরা আন নূর, আয়াত : ৩৭)
সুরা আন নূরের ওই আয়াতে ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। ঈমানদাররা যেমন শুধু মসজিদে বসে থাকতে পারে না, তেমনি তারা আল্লাহর কথা ভুলে শুধু ব্যবসায়-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকতে পারে না। এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় করাই প্রকৃত ইসলাম।
ব্যবসায়-বাণিজ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রিজিকের ১০ অংশের ৯ অংশই ব্যবসায় বাণিজ্যের মধ্যে এবং এক অংশ গবাদি পশুর কাজে নিহিত। ’ (আল জামিউস সাগির, হাদিস : ৩২৮১)
তিনি ব্যবসায়ীদের মর্যাদা তুলে ধরে বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সৎ ব্যবসায়ীরা সিদ্দিক ও শহীদের সঙ্গে উঠবেন। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৩৯)
একবার জায়েদ ইবনে মাসলামা (রা.) আপন ক্ষেতে বৃক্ষরোপণ করছিলেন। তাঁকে দেখে ওমর (রা) বলেন, ‘তুমি চমৎকার কাজ করছ। মানুষের কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যাওয়া উচিত। এতে তোমার দ্বিনদারি অধিক সংরক্ষিত থাকবে এবং এভাবেই তুমি মানুষের প্রতি বেশি অনুগ্রহ করতে পারবে। ’ (ইহইয়াউ উলুমিদদ্বিন : ২/৩৫১)
এই কথার মাধ্যমে ওমর (রা.) নিজে উপার্জনের প্রতি আগ্রহী হওয়াকে উৎসাহিত করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ব্যবসায় করেছেন। তিনি খাদিজা (রা.) ব্যবসায় পরিচালনা করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসায় করেছেন। মুহাজির সাহাবিগণের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ব্যবসায় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
পরিশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য জীবনযাপনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রধান উপকরণ।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ইসলামী ব্যাংকার। সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। বর্তমানে কো-অর্ডিনেটর, স্ট্যান্ডার্ড (ইসলামী) ব্যাংক লিমিটেড
সূত্র-কালের কন্ঠ
Leave a Reply