
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সাতভিটা গ্রামের সরু কাঁচা পথ পেরিয়ে আশিকুর রহমান আশিকদের বাড়িতে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে নিস্তব্ধ এক উঠোন। দুপুরের রোদ মাটিতে পড়ে আছে, কিন্তু বাড়ির ভেতরের পরিবেশে যেন সময় থমকে আছে। কথাবার্তা কম, দীর্ঘশ্বাস বেশি। যে ঘরে একসময় তরুণ শিক্ষার্থী আশিকের হাসির শব্দ ভেসে আসত, সেই ঘর এখন স্মৃতির নীরবতায় ভারী।
ঘরের একটি কাঠের আলমারিতে এখনো যত্নে রাখা আছে আশিকের কয়েকটি বই, ব্যবহৃত পোশাক, পরিচয়পত্র ও কিছু ব্যক্তিগত জিনিস। পরিবারের কেউ সেগুলো সরিয়ে ফেলতে পারেননি। যেন এগুলোই আজ তাদের কাছে আশিকের বেঁচে থাকার শেষ চিহ্ন।
বাড়ির উঠোনে বসে কথা হচ্ছিল আশিকের বাবা চাঁদ মিয়ার সঙ্গে। কথা বলতে বলতে কয়েকবার থেমে গেলেন তিনি। দূরে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন, “মানুষ বলে সময় সব ব্যথা কমিয়ে দেয়। কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর ব্যথা কোনোদিন কমে না। দরজায় শব্দ হলেই মনে হয়, আমার আশিক বুঝি ফিরে এসেছে।”
কথা শেষ করতে না করতেই চোখ ভিজে ওঠে তার। পাশে বসে থাকা স্বজনরাও নীরবে চোখ মুছতে থাকেন।
একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত গল্প
আশিক ছিলেন উলিপুরের পাঁচপীর ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কৃষক পরিবারের এই মেধাবী তরুণ মাত্র সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। সংসার, পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল অনেক স্বপ্ন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দিন কুড়িগ্রাম শহরের শাপলা চত্বরে সংঘর্ষে মাথায় ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়।
টানা ২৭ দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আশিক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে যায় একটি তরুণ জীবনের সব স্বপ্ন।
“আমরা রাজনীতি করতে যাইনি”
আশিকের ছোট ভাই আতিকুর রহমান সেই দিনের স্মৃতি মনে করে বলেন, “আমি আর ভাইয়া কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম। হামলায় আমিও আহত হয়েছিলাম। ভাইয়ার মাথায় ইট লাগে। প্রথমে বুঝতে পারিনি আঘাতটা এত ভয়াবহ ছিল। পরে চিকিৎসকরা জানান, মাথায় রক্তক্ষরণ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভাইয়াকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি।”
তার কথায় এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই দিনের আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব।
গ্রামজুড়ে আজও শোকের ছায়া
সাতভিটা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, আশিকের মরদেহ যখন গ্রামে পৌঁছায়, তখন হাজারো মানুষ শেষবারের মতো তাকে দেখতে ভিড় করেছিলেন। জেলা শহীদ মিনার, পাঁচপীর ডিগ্রি কলেজ এবং গ্রামের স্কুল মাঠে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
প্রতিবেশীদের ভাষায়, আশিক ছিলেন ভদ্র, বিনয়ী ও স্বপ্নবাজ একজন তরুণ। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামকে শোকাহত করেছিল।
স্মরণ নয়, বাস্তব সহায়তার প্রত্যাশা
দুই বছর পরও আশিকের পরিবারের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—অনেক প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবতার পরিবর্তন খুব কম।
চাঁদ মিয়া বলেন, “ছেলে তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যদি শহীদ পরিবারের দায়িত্ব নেয়, বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে মনে হবে ছেলের আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া হয়েছে।”
পরিবারের সদস্যদের দাবি, শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, বিধবা স্ত্রীদের কর্মসংস্থান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা হোক।
একটি বাড়ি, অনেক প্রশ্ন
সাতভিটার সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। উঠোনে নেমে আসছিল নীরবতা। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আশিকের বাবা। চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল গ্রামের পথের দিকে।
মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো এখনো অপেক্ষা করছেন—হঠাৎ করেই ছেলে ফিরে এসে ডাকবে, “আব্বা…”
বাস্তবতা জানে, সেই ডাক আর কোনোদিন শোনা যাবে না। কিন্তু অপেক্ষা থেমে থাকে না। সেই অপেক্ষা এখন শুধু একজন সন্তানের জন্য নয়; রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেওয়ার জন্যও।
জুলাইয়ের আন্দোলনের দুই বছর পরও সাতভিটার সেই বাড়ি নীরবে মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসে শহীদদের নাম লেখা হয়, কিন্তু তাদের স্বজনদের জীবনও ইতিহাসেরই অংশ। সেই ইতিহাসের দায় কেবল স্মরণসভায় নয়, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মধ্যেই পূর্ণতা পায়।