
ডিজেলের সংকটে বন্ধের পথে নদীতে মাছ ধরা। স্থবির হয়ে পড়েছে মৎস্য পল্লী। অবরোধ শেষে সাগরে মাছ শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চরফ্যাশন উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো জেলে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডিজেলের তীব্র সংকটে আর নদী ও সাগরে যাওয়া হচ্ছেনা জেলেদের।এক সপ্তাহ ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চরফ্যাশন সামরাজ মৎস্যঘাটে বসে বসে অলস সময় কাটছে জেলেদের। অনেক জেলে ট্রলার গভীর সাগরে যেতে নিত্য প্রয়ীজনীয় বাজার-সওদা করলেও জ্বালানির অভাবে যেতে না পেরে তা ঘাটেই শেষ করছেন তারা। কবে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের যোগান পাবেন তা নিশ্চিত হতে পারছেন না জেলেরা। সামরাজ মৎস্যঘাটে প্রতিদিন শত শত ট্রলার মাছ নিয়ে ঘাটে এসে ভিড় জমাতো। আর এ মৎস্যঘাটে বর্তমানে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। যার কারণে বরফ মিলেও লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ী ও ঘাটের আড়ত মালিক এবং শ্রমিকরা।
জ্বালানি সংকটে বঙ্গোপসাগরগামী ট্রলার ও উপকূলীয় এলাকার ছোটো নৌকা বা ফিশিংবোট দিয়ে নদ-নদী থেকে মাছ আহরণ ৫০ শতাংশ কমে গেছে বলে দাবি করেছেন জেলে ও সংশ্লিষ্টরা। এতে সাগর উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা গেছে। যারফলে মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থানে দেখা দিয়েছে এক অনিশ্চয়তা।
জানাগেছে,চরফ্যাশনে ছোট বড় মিলিয়ে ১৩২৭ টি ট্রলার ও নৌকা রয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, প্রজনন নিশ্চিত করা ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে এ সময় বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। কিন্তু ডিজেল সংকটের এ ভোগান্তি না কাটতেই এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মৎস্যজীবীরা। অথচ নতুন বছরে বৈশাখে রয়েছে হালখাতা অনুষ্ঠান। হাটাবাজারে দেনা পাওনার হিসাব-নিকাশে বছর জুড়ে সদাই-পাতি নেয়া বকেয়ার লেনদেন মেটানোর তাগাদা। মুদি থেকে শুরু করে মৎস্য আহরণে বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটায় বাকি ধার-দেনার শেষ নেই জেলে মাঝিমাল্লাদের। অসংখ্য জেলে এখন ট্রলার ছেড়ে হাল গেরস্তে কামলা খাটছেন। স্থানীয় জ্বালানি পাম্পগুলোতে পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে তেল দেয়া হচ্ছে, তবুও মেটানো যাচ্ছে না চাহিদা।
উপজেলার নতুন স্লুইসগেট এলাকার মৎস্যঘাটের এফভি ‘আল্লাহর দান’ ফিশিং বোটের মাঝি মো. বাবুল মিয়া বলেন,গভীর সমুদ্রে এক সপ্তাহ অবস্থান করে মাছ শিকারে গেলে ১হাজার থেকে ১২শ লিটার ডিজেল বা জ্বালানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের বোট মাত্র ৩৫০ লিটার ডিজেল নিয়ে গভীর সাগরে যেতেই দুই দিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। ইদানীং ডিজেল না পাওয়ায় ট্রলিং বোটের ১৮ জন জেলে ও মাঝিমাল্লাসহ ঘাটে বসেই অলস সময় কাটাচ্ছি। সাগরে যেতে না পারায় তাদের সকল খরচ বহন করতে হচ্ছে ট্রলার মালিককে।
চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মৎস্য আড়ত মালিক শাহাবুদ্দিন চৌধুরী বলেন, সামরাজ মৎস্যঘাটে প্রতিদিন ৩২ থেকে ৩৪ হাজার লিটার পেট্রোল ও ৬০থেকে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে এর এক-দশমাংশও সরবরাহ না থাকায় মৎস্য ব্যবসা ও জেলেদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটছে। যার ফলে প্রায় ৪ হাজার জেলে সামরাজ এলাকায় বেকার বসে দিন কাটাচ্ছে। আড়তদার সুমন বলেন, কক্সবাজার,চট্টগ্রাম ও পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে কিছু নৌ-যান নদী ও সাগরে মাছ শিকারে যাচ্ছে। পরিমাণে অল্প কিছু মাছ নিয়ে এসব বোট ঘাটে আসছে। এছাড়া শতশত ট্রলার ঘাটে নঙ্গরে রয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, জ্বালানি সংকটে এ অঞ্চলে মাছ আহরণ ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জ্বালানি তেলের নিশ্চয়তা চেয়েছেন এখানকার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে,যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, তা সঠিকভাবে সর্বাত্মক বিতরণ ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে জানান চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এমাদুল হোসেন।
Leave a Reply