
সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সহজাত অধিকারের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে পরিষদ। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সর্বসম্মতভাবে গৃহীত এক প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতিতে সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সহজাত অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।
আরব নিউজের তথ্য মতে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলতি মাসে চালানো প্রাণঘাতী হামলার কথা উল্লেখ করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা ১০ ও ১১ অক্টোবর বিমানবন্দরটিতে চালানো ‘বেপরোয়া হামলার’ নিন্দা জানান। এসব হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এ ছাড়া সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনায় একাধিক হামলার কথাও উল্লেখ করেন তারা।
পরিষদের মতে, এসব হামলায় বেসামরিক বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থানে এটি একটি উল্লেখযোগ্য কঠোর পদক্ষেপ। প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতি গ্রহণের জন্য পরিষদের ১৫ সদস্যের সবার সম্মতি প্রয়োজন হয় এবং প্রকাশ্য বৈঠকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা হয়। ফলে ৭ আগস্ট ও ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আগের সংবাদ বিবৃতিগুলোর তুলনায় বৃহস্পতিবারের বিবৃতিটি বেশি গুরুত্ব বহন করে।
আগের বিবৃতিগুলোতেও হুথিদের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনায় হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। নতুন বিবৃতিতে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনায় হামলার ঘটনায় দেশটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সহজাত অধিকারের স্বীকৃতি দেন।
হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পাশাপাশি সৌদি সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত ও সম্পূর্ণ সুস্থতাও কামনা করা হয়।
এছাড়াও বিবৃতিতে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হুথিদের অব্যাহত হামলা ও হুমকিরও নিন্দা জানানো হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন এবং নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানায় নিরাপত্তা পরিষদ । এতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
এ বার্তায় ২০১৫ সালের এপ্রিলে গৃহীত ২২১৬ নম্বর প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন নিরাপত্তা পরিষদ। ওই প্রস্তাবে হুথিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গোষ্ঠীটির হাতে আরও হামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন পৌঁছানো ঠেকাতে ইয়েমেন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে পরিষদ। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বিষয়ে জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়। পরিষদ বলেছে, ‘সহিংসতা, জবরদস্তি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইয়েমেনে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’
ইয়েমেন সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গের প্রচেষ্টার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদ এমন একটি সমঝোতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে যার নেতৃত্ব ও মালিকানা থাকবে ইয়েমেনিদের হাতে।
গত ১০ অক্টোবর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলাটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দরের ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালসংবলিত অংশে আঘাত হানে। নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিলেন আরব বিশ্বের ও গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে চারজন সৌদি, দুজন বাংলাদেশি এবং মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একজন করে নাগরিক ছিলেন।
১১ অক্টোবরের হামলায় সৌদি আরবে বসবাসরত একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন এবং ১১ জন আহত হন। এর আগে ৮ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে হামলায় একজন পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন এবং সৌদিয়া এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়। ওই হামলায় আহত হন আরও কয়েক ডজন মানুষ।
এ ছাড়া ৬ ও ৭ অক্টোবর আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় আলজেরিয়া ও মরক্কোর দুই নারী নিহত এবং ২৮ জন আহত হন। একই সময়ে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরেক হামলায় সুদানের একজন নাগরিক নিহত ও আটজন আহত হন।