1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
উদ্ভাবনের পথে হেঁটে প্রকৌশলী তাসরুজ্জামানের বিশ্বজয়ের গল্প - আজকের কাগজ
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন

উদ্ভাবনের পথে হেঁটে প্রকৌশলী তাসরুজ্জামানের বিশ্বজয়ের গল্প

রুয়েট প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৫:৪৩ পিএম
শেয়ার করুন

রেলগাড়ির চাকাকে ঘোরাতে হয় নিয়ম মেনে—ঠিক যেমন জীবনের পথও ঘোরে অভিজ্ঞতা আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। সেই ঘূর্ণনের মাঝেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী মো. তাসরুজ্জামান বাবু। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় রেলওয়ে টার্নটেবিলসহ একাধিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি শুধু রেলের একটি যান্ত্রিক সমস্যার সমাধান করেননি, বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রকৌশল সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ স্টেভি অ্যাওয়ার্ডের দুটি ভিন্ন প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে তাসরুজ্জামান বাবু অর্জন করেছেন একটি গোল্ড ও দুটি সিলভার পদক। ‘স্টেভি অ্যাওয়ার্ডস ফর টেকনোলজি এক্সিলেন্স’ এর ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে তিনি ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ হিসেবে গোল্ড স্টেভি লাভ করেন। নিউইয়র্কে আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ফোর্ড মোটর কোম্পানি ও জেনারেল মোটরসের উদ্ভাবকদের পেছনে ফেলে এই স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। একই ক্যাটাগরিতে ‘বেস্ট এমপ্লয়ি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে তিনি পান সিলভার স্টেভি অ্যাওয়ার্ড। এর আগে ২০২৫ সালের এশিয়া-প্যাসিফিক স্টেভি অ্যাওয়ার্ডসে ‘মোস্ট ইনোভেটিভ টেকনোলজি লিডার অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে সিলভার স্টেভি অর্জন করেন তিনি। ফলে স্টেভি অ্যাওয়ার্ডের দুটি প্রোগ্রাম মিলিয়ে তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে একটি গোল্ড ও দুটি সিলভার পদক।

স্টেভি অ্যাওয়ার্ড (Stevie Award) কী?
বিশ্বব্যাপী ব্যবসা ও পেশাগত ক্ষেত্রের শীর্ষ সম্মাননা পুরস্কার হলো স্টেভি অ্যাওয়ার্ড যাকে ‘অস্কার অব দ্য বিজনেস ওয়ার্ল্ড’ নামেও ডাকা হয়। এটি বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়িক সাফল্য, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের জন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সম্মানিত করে। ২০০২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা Stevie Awards Organization প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা‑ধর্মী এই পুরস্কার দিয়ে থাকে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি অংশগ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও এটি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম বিভক্ত যেমন Asia‑Pacific, MENA, International Business Awards, Technology Excellence ইত্যাদি। উদ্ভাবন, নেতৃত্ব, গ্রাহক সেবা, টেকনোলজি, নারীর উদ্যোগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিপণন উদ্যোগ সহ নানা ক্যাটেগরি গুলোর মধ্যে গোল্ড, সিলভার ও ব্রোঞ্জ এই তিন ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সক্ষম হয়, যা তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ, মার্কেটিং ও পেশাজীবনে মূল্য যোগ করে। এছাড়াও পুরস্কার বিজয়ীরা তাদের কোম্পানির সাফল্য বা নতুনত্বকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পারে।

কেন এতো আকাঙ্ক্ষার বিষয় স্টেভি অ্যাওয়ার্ড?
এই স্বীকৃতি এর আগে পেয়েছে ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত মেটা, গুগল, অ্যামাজন, অ্যাপল, আইবিএম, মাইক্রোসফট, লিংকডইন, স্টারবাকস, অ্যাডোবি, স্যামসাং, ডিএইচএল, ব্যাংক অব আমেরিকা, ফোর্ড ও জেনারেল মোটরসের মতো বহু প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক এই সম্মানজনক পদক প্রাপ্তদের তালিকায় যুক্ত হতে পারা একজন উদ্ভাবকের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে থাকে। তেমনি একজন বাংলাদেশি রেলওয়ে প্রকৌশলীর নাম যুক্ত হওয়াকে দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেমন ছিল প্রকৌশলী তাসরুজ্জামানের জীবনযাত্রা?
এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ১৯৮৯ সালের ৩১ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করা তাসরুজ্জামান বাবু মাত্র বারো বছর বয়সে বাবাকে হারান। সেই সময় থেকেই মা হয়ে ওঠেন তার শক্তি ও পথচলার আলোকবর্তিকা। পড়াশোনা করেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগে (২০০৮–০৯ শিক্ষাবর্ষ)। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ (গ্রিপস) থেকে এডিবি-জেএসপি স্কলারশিপে পাবলিক পলিসিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগে যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) হিসেবে কর্মরত।

উদ্ভাবনের পেছনের গল্প!
২০২২ সালে লালমনিরহাটে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার চোখে পড়ে এক বড় বাস্তবতা—শতাধিক বছরের পুরোনো এই রেল বিভাগে নেই ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর টার্নটেবিল। ফলে নিয়মিতভাবে মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ ঢাকায় পাঠাতে হতো, যা ছিল ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। সমস্যাটিকে এড়িয়ে না গিয়ে তিনি খুঁজতে থাকেন সমাধানের পথ। সীমিত দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করেই তৈরি করেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্বয়ংক্রিয় রেলওয়ে টার্নটেবিল।

এই টার্নটেবিল ব্যবহারে ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর ফলে চাকার দুই পাশ সমানভাবে ক্ষয় হয়, চালক সহজে সিগন্যাল দেখতে পারেন এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমে আসে এবং অপারেশনাল দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এই উদ্ভাবনের জন্য ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তিনি ‘বেস্ট ইনোভেটর’ স্বীকৃতি লাভ করেন। পাশাপাশি জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) থেকেও পান প্রশংসাপত্র।

তার আর কি কি উদ্বোধন আছে?
শুধু টার্নটেবিলেই থেমে থাকেননি এই প্রতিভাবান উদ্ভাবক। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লালমনিরহাটে কর্মরত অবস্থায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেন ভাঙন প্রতিরোধী দীর্ঘস্থায়ী হুইলসেট গাইড, লাইনচ্যুত লোকোমোটিভ ও কোচ উদ্ধারে ব্যবহৃত রি-রেলিং যন্ত্র এবং দেশের প্রথম ইলেকট্রিক লিফটিং জ্যাক। এসব উদ্ভাবন রেলওয়ের নিরাপত্তা, দক্ষতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা দেশের রেলওয়ে প্রযুক্তির বাস্তব ও সময়োপযোগী পরিবর্তনে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

তরুণদের প্রতি তাসরুজ্জামানের প্রত্যাশা কি?
রুয়েট রিপোর্টার্স ইউনিটিকে দেওয়া এক বক্তব্যে জনাব তাসরুজ্জামান বাবু বলেন,”আমাদের সময়ের চেয়ে এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি স্মার্ট, মেধাবি। ইন্টারনেটের প্রসারে বিশ্ব তাদের হাতের মুঠোয়। তাই আমি যদি এরকম কিছু করতে পারি, তারা আরো বড় কিছু করে দেখাবে- এই বিশ্বাস আমার আছে। স্নেহের অনুজদের তাই বলব, তোমাদের মধ্যে শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান নয়, লিডারশিপ কোয়ালিটির জন্ম দাও। কারণ যে কোনো বড় কিছু নিজের মেধা দিয়ে হয় না, বরং বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। এই সমন্বয়ের গুণ থাকলে যে কোনো বড় কাজ করা সম্ভব।”

দেশীয় প্রযুক্তিতে রেলের টার্নটেবিল উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য রুয়েট পরিবারের পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রুয়েট ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন,“রুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে তাসরুজ্জামান বাবুর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় রেলওয়ে টার্নটেবিলসহ তার একাধিক বাস্তবভিত্তিক উদ্ভাবন প্রমাণ করে, রুয়েটের শিক্ষার্থীরা একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার টেকসই ও কার্যকর সমাধান করতে বিশ্বমানের সক্ষমতা রাখে। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবন সম্ভব—রুয়েট শিক্ষার্থী তাসরুজ্জামান বাবু তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”

এছাড়াও তিনি তাসরুজ্জামান বাবুর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করে বলেন,”তার এই অর্জন দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে নতুন প্রজন্মকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও আগ্রহী করে তুলবে বলে আমার বিশ্বাস। এই সাফল্য আমাদের বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন, গবেষণা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে। তারা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে। রুয়েট সবসময় এমন প্রকৌশলী গড়ে তুলতে চায়, যারা কেবল কারিগরি দক্ষতায় নয়, বরং নেতৃত্ব, মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়ও সমানভাবে সক্ষম।”

প্রকৌশল সমাজের মতে, তাসরুজ্জামান বাবুর এই অর্জন কেবল একজন প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রমাণ করে—দেশীয় প্রযুক্তি ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগালে বৈশ্বিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা সম্ভব। নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলীদের জন্য এই গল্প হয়ে উঠতে পারে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *