
জীবনের ১০৪টি বছর পার করে এখন ১০৫-এর পথে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, দুই পা প্রায় অচল, কানেও ঠিকমতো শুনতে পান না। তবুও আজ পর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো বার্ধক্য ভাতা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা। অনেক সময় দু’বেলা খাবারও জোটে না। মানবেতর জীবনযাপন করছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের রাজারাম ক্ষেত্রী গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ উদ্দিন ফকির।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন হাফেজ উদ্দিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে কোনোমতে জীবন চালিয়ে নেন। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট সংসার। মেয়ের বিয়ের পর সে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। এরপর এক দুর্ঘটনায় দুই পা ভেঙে গেলে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েন তিনি।
সংসারের দুঃসময় আরও ঘনীভূত হয় সাত বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর। তারপর থেকে নিধুয়া পাথার এলাকার একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে একাই বসবাস করছেন তিনি। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিজের প্রয়োজনীয় কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না। নেই নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস, নেই দেখভালের মতো কাছের মানুষ।
হাফেজ উদ্দিনের ভাতিজা রফিকুল ইসলাম বলেন, “তিনি আমার চাচা। যতটুকু পারি সহযোগিতা করি। মাঝে মধ্যে খাবার নিয়ে যাই। গ্রামের মানুষও সাধ্যমতো সাহায্য করেন। কিন্তু নিয়মিত তিনবেলা খাবার দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমি নিজেও একজন কৃষক। তারপরও মানবিক দায়িত্ব থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, হাফেজ উদ্দিনের নিজের কোনো জমিজমা নেই। অন্যের জায়গায় নির্মিত একটি জরাজীর্ণ ঘরেই তাঁর বসবাস। ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রাত কাটাতে হয় তাঁকে। নেই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কিংবা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বয়স ও অসহায়ত্ব বিবেচনায় তিনি সরকারি সহায়তার উপযুক্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ভাতা পাননি। স্থানীয়দের মতে, একটি বার্ধক্য ভাতা, একটি টয়লেট, একটি সোলার লাইট এবং নিয়মিত খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা হলে জীবনের শেষ সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারতেন এই প্রবীণ ব্যক্তি।
সবচেয়ে দুর্ভোগের বিষয় হলো, তাঁর ঘরে পৌঁছানোরও নেই কোনো উপযুক্ত রাস্তা। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় খাবার পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা নামলেই নির্জন পরিবেশে চারপাশে শিয়ালের আনাগোনা শুরু হয়। সেই নিঃসঙ্গ ঘরেই রাত কাটান শতবর্ষী এই বৃদ্ধ।
তবে এত কষ্টের মধ্যেও কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তাঁর। নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “আল্লাহ সব দেখছেন, তিনিই বিচার করবেন।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করবেন। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া—দু’বেলা খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর সামান্য মানবিক সহমর্মিতা।