
পিরোজপুরে ১৭ বছর আগে কলেজছাত্রী ঝর্ণা রানী দেউড়ীকে অপহরণ ও হত্যার মামলায় জজ আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি লিটন মণ্ডলকে খালাস দিয়েছে হাইকোর্ট।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান নেতৃত্বাধীন নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার জন্য গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ হয়েছে।রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধে মৃত্যুর কথা বলা হলেও মরদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আইনি দুর্বলতা ছিল। ভিকটিমের বাবা সরাসরি মরদেহ না দেখেই থানায় কেবল কাপড়চোপড় এবং পুলিশের দেখানো একটি ছবির ওপর ভিত্তি করে মেয়েকে শনাক্ত করেন। শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত ওই ছবিটি নিম্ন আদালতের নথিতে (এলসিআর) সংযুক্ত ছিল না। আদালতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত আসামিকে খালাস দিয়েছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বুলবুল রাবেয়া বানু একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাবেয়া বানু বলেন, ‘ঘটনা ১৪ তারিখের, কিন্তু একজন সাক্ষী ১৭ তারিখ মৃতদেহ পাওয়ার পর বলছেন যে, তিনি দুজনকে একসঙ্গে যেতে দেখেছেন। কাউকে জোর করে টেনে নিয়ে গেলে সে নিশ্চয় চিৎকার করত, পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজন কেউ না কেউ তা দেখত।’
স্বাক্ষীর নীরবতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ১৪ তারিখে কিছুই জানাননি। ১৬ তারিখে অজ্ঞাত মৃতদেহ দাফন করার পর ১৭ তারিখে এসে তিনি এসব কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘শুরুতে মামলাটা করা হয়েছিল অপহরণের অভিযোগে, পরে এর সঙ্গে হত্যা যুক্ত করা হয়। কিন্তু নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ঘটনাটি কোনোভাবেই অপহরণের আইনি সংজ্ঞায় পড়ে না।’
২০১৯ সালের ২৭ জুন পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মিজানুর রহমান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পলাতক আসামি লিটন মন্ডলকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৭ ধারা তৎসহ দণ্ডবিধির ৩০২/২০১ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রতন দেউরী, রনজিৎ হাওলাদার এবং বিপুল শাখারী নামের অপর তিন আসামিকে খালাস দেয় বিচারিক আদালত। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মোট ১২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভিকটিম ঝর্ণা রাণী দেউরী রামচন্দ্রপুর শাহ মাহামুদিয়া কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের ২৪ মে তার বাবা সুভাষ চন্দ্র দেউরী নেছারাবাদ থানায় মামলাটি করেন। এজাহারে বলা হয়, প্রতিবেশী লিটন মন্ডল ঝর্ণাকে উত্ত্যক্ত করত এবং বিয়ের প্রস্তাব দিলে পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে।
২০০৯ সালের ১৪ মে বাগেরহাটের কচুয়া থানার আন্দার মানিক গ্রামে বড় বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঝর্ণা নিখোঁজ হন। ওইদিনই স্বরূপকাঠী কৌরিখাড়া খেয়ার ট্রলারে লিটন ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ঝর্ণাকে দেখতে পান সুমন দেউরী নামের এক সাক্ষী। পরে ১৭ মে পত্রিকায় বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে অজ্ঞাত তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের খবর দেখে ভিকটিমের বাবা থানায় গিয়ে পরিধেয় বস্ত্র দেখে তা ঝর্ণার মরদেহ বলে শনাক্ত করেন।