
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল শৃঙ্খলায় আনতে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। ঢাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে এসব যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে বৈধ অটোরিকশা এবং সরিয়ে দেওয়া হবে অনিবন্ধিত যানবাহন।
সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
নতুন বিধিমালা প্রকাশের পর চালকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “একসঙ্গে সব ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে না। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে এবং অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের কিছুটা সময় দিতে হবে।”
নতুন বিধিমালাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলের জন্য মোট আটটি জোন নির্ধারণ করা হবে। দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতে থাকবে চারটি করে জোন। প্রতিটি জোনের রিকশা চেনার জন্য আলাদা রং ব্যবহার করা হবে। ফলে একটি জোনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।”
কোন এলাকায় কতসংখ্যক রিকশা চলাচল করবে, তা নির্ধারণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে কাজ করবে। যানবাহনের সংখ্যা বেশি হলে যাতে সড়কে চাপ ও যানজট না বাড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। বিধিমালায় নিবন্ধনের জন্য ই-রিকশাপ্রতি আট হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধন প্লেটের জন্য দিতে হবে আরো এক হাজার টাকা। প্রতি বছর নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। তবে নবায়ন ফি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে নির্দিষ্ট অঙ্ক জানানো হয়নি।
নিবন্ধিত প্রতিটি রিকশার জন্য থাকবে আলাদা নম্বর ও কিউআর কোড। এতে মালিকের পরিচয়, নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং কোন জোনে যানটি চলাচল করতে পারবে, তা উল্লেখ থাকবে। চালকদের পরিচয় নিশ্চিত করতে আপাতত পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “শুরুতে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। নিবন্ধন কার্যক্রম কিছুটা এগিয়ে গেলে এ বিষয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। পরে ধাপে ধাপে চালকদের লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে।”
ই-রিকশার নকশার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে যেসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, সেগুলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। নির্ধারিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই নিবন্ধনের সুযোগ মিলবে। নতুন করে যারা এসব যানবাহন তৈরি করবেন, তাদেরও অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করতে হবে।
চার্জিং ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন নির্দেশনা রয়েছে বিধিমালায়। নির্ধারিত স্থানে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
অন্যদিকে, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রিকশা চার্জ দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা এসব কার্যক্রম তদারক করবেন।
কোন সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে, তা নিয়েও বিধিনিষেধ থাকছে। যেসব সড়কে বাস চলাচল করে, সেসব রাস্তায় ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
ই-রিকশার ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মালিকপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন আলোচনা করে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ঠিক করবে। সাধারণ যাত্রীদের সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ভাড়া নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।”
নিবন্ধন কার্যক্রম কত দিনের মধ্যে শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি প্রতিমন্ত্রী। তবে কার্যক্রম শুরুর এক মাস পর সাংবাদিকদের সঙ্গে বসে অগ্রগতি তুলে ধরার কথা জানান তিনি। তখন কতসংখ্যক রিকশা নিবন্ধিত হয়েছে এবং অনিবন্ধিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানানো হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো আইনগত নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করছে। সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯ সংশোধনের মাধ্যমে এসব যানবাহন নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। আইনের ১২০ ধারার আলোকে নতুন বিধিমালা করা হয়েছে।”
প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় এ বিধিমালা কার্যকর হবে। পৌরসভা এলাকায় ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের পর পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।