
অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধের মেঘ কিছুটা হলেও কাটলো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ চরম আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
চুক্তির প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে এই চুক্তির ঘোষণা দেন। তিনি শর্ত দিয়েছেন যে, ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। চুক্তির খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
তেহরানের উল্লাস ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া: চুক্তির খবর শোনার পর ইরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। পতাকা হাতে বিজয় মিছিল করতে দেখা যায় অনেককে। তবে এর মধ্যেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের সংশয় রয়েছে। তেহরানের এক সরকারি কর্মচারী রয়টার্সকে ফোনে বলেন, ইসরায়েল হয়তো এই কূটনীতি সফল হতে দেবে না এবং ট্রাম্পও নিজের অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। তবে, অন্তত আজকের রাতটা আমরা বোমা হামলার ভয় ছাড়াই শান্তিতে ঘুমাতে পারব।
বিজয়ের দাবি ও রাজনৈতিক সমীকরণ: ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতিকে ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল একে ইরানের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ এবং শত্রুর ‘শোচনীয় পরাজয়’ বলে অভিহিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুপারপাওয়ার আমেরিকার প্রচণ্ড আক্রমণ সত্ত্বেও ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব টিকে গেছে এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা কিংবা মিসাইল ভাণ্ডার পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
ইসরাইলি রাজনীতিতে তোলপাড়: এই যুদ্ধবিরতি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। কিন্তু তা না হওয়ায় ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ একে ‘কূটনৈতিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা ইয়ার গোলান বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা অক্ষত আছে এবং এই যুদ্ধ থেকে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে বের হয়ে আসছে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।
লেবাননে হামলা অব্যাহত: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেও লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান থামেনি। নেতানিয়াহুর কার্যালয় স্পষ্ট করেছে যে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান ও কামান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি একটি হাসপাতালের নিকটবর্তী ভবনে হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা: আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসবেন। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল সম্পূর্ণ নির্মূলের দাবি জানাচ্ছে, সেখানে ইরান সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। ফলে এই দুই সপ্তাহের বিরতি কি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে, নাকি আবারও ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজবে, তা নিয়ে পুরো বিশ্ব এখন গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছে।
Leave a Reply