
সোমবার ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক সদস্যদের নিয়ে যৌথবাহিনীর অভিযানে ২২ জনকে আটকের তথ্য দিয়েছে জেলা পুলিশ। যৌথ অভিযানে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এইদিকে দিনভর বিশেষ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকারীদের ধরতে না পারলেও দীর্ঘদিন পর ওই এলাকার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিতে পারাকে ‘অর্জন’ হিসেবে দেখছে পুলিশ ও প্রশাসন।
তবে সেখানকার অপরাধ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন উদ্দিন ধরা পড়েনি এ অভিযানে।
পরিচালিত এ অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), এপিবিএন, আরআরএফসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বমোট ৩,১৮৩ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযানের পরপরই সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করার তথ্য দেন চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ। বলেন, “সেখানে পুলিশ ও র্যাব মিলে ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশাকরি পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।
এখন ওই এলাকায় সরকারের আগের পরিকল্পনা অনুসারে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে চায় স্থানীয় প্রশাসন।
অভিযান চলে যেভাবে:
সেনা, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সুসজ্জিত সদস্যরা দলে দলে এদিন যখন জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করছিলেন তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র।
ভোর সাড়ে ৫টা থেকে যৌথ বাহিনী এই বিশেষ অভিযান শুরু করে। দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনায় ৩টি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, র্যাব ও সিএমপি’র ৩টি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা একযোগে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানটি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) মো: আহসান হাবীব পলাশ, বিপিএম-সেবা এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এ সময় র্যাব-৭, চট্টগ্রাম এর সিও লে. কর্ণেল মো: হাফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো: নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন সরেজমিনে উপস্থিত থেকে সার্বিক অভিযান তদারকি ও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।
অভিযানের বিষয়ে পরে রাতে জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্র মজুদ, পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, অপরাধীদের আশ্রয়স্থল তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে এ অভিযান হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে ‘কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করে অভিযান পরিচালনা করে।
বড় এলাকা হওয়ায় কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে অভিযান শুরু করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
অভিযানে বাধা দিতে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল অংশের পর আলী নগরের প্রবেশপথে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রাখা হয়েছিল।
সেখান থেকে একটু এগিয়ে যাওয়ার পর অভিযানকারী দলের সদস্যরা দেখতে পান, স্থানীয় খালের ওপর একটি কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে। সেটি ইটবালি সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করে ভেতরে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করেন সদস্যরা।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান গ্রহণ করে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানসমূহে তল্লাশি চালানো হয়।
সিসি টিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ :
জেলা পুলিশ জানায়, অভিযান চলাকালে বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে মোট ২২ জনকে আটক করা হয়। এ সময় যৌথ বাহিনী ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি দেশীয় পিস্তল ও ১টি এলজি, ২৭টি পাইপগান, ৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৫৭টি অস্ত্র তৈরির পাইপ, ৬১টি কার্তুজ, বিভিন্ন ধরনের ১১১৩ রাউন্ড গুলি, ১১টি ককটেল (বিস্ফোরক), পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও ১৯টি সিসি ক্যামেরা, ৩টি ডিভিআর, ১টি পাওয়ার বক্স এবং ১টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়েছে, যা অপরাধীদের নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
উক্ত যৌথ অভিযানে আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ডের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়। পাশাপাশি আলীনগরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ ও পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ওয়াচ টাওয়ারগুলোর কার্যক্রমও ভেঙে দেওয়া হয়ে। এসব ওয়াচ টাওয়ার ব্যবহার করে অপরাধীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ নিয়ন্ত্রণ করা হয় স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে।
সেখানকার বাসিন্দারা ছাড়া অন্যরা প্রবেশ করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। অতীতে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে হামলার শিকারও হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সমিতির সদস্যপদ নিতে হয় টাকার বিনিময়ে। পরে সমিতিকে টাকা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একেক খণ্ড জমির দখল নিয়ে ঘর তোলা হয়। ঘর তুলতেও নিয়ন্ত্রকদের টাকা দিতে হয়। এলাকার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হচ্ছে সিসি ক্যামেরা।
ধরা ছোঁয়ার বাইরে মূল ‘নিয়ন্ত্রকরা’ :
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেখানে আবারও স্থানীয় অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। কয়েকবার সংঘর্ষ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন।
ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
সর্বশেষ দুর্গম পাহাড়ি ওই এলাকায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর সদস্য নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।সেই সন্ত্রাসী ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসে জঙ্গল সলিমপুর।
নিহতের জানাজায় এসে র্যাব প্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর প্রায় দেড় মাস পর সোমবার (৯ মার্চ) পরিচালিত হয় সেই অভিযান।
জঙ্গল সলিমপুরের দুই অংশ- ছিন্নমূল ও আলী নগর। এরমধ্যে ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ রোকন উদ্দিন ও তার অনুসারীদের হাতে এবং আলী নগরের নিয়ন্ত্রণ মোহাম্মদ ইয়াছিন ও তার অনুসারীদের হাতে।
সোমবারের এই অভিযানেও হাতের নাগালে আসেনি এই দুই পক্ষের নেতৃত্বদানকারী ও তাদের অনুসারীরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, জঙ্গল সলিমপুর বিশাল এবং অনেক দুর্গম এলাকা, চারিদিকে পালানোর পথ আছে। অভিযানে এজাহারনামীয় ১১ জনকে আটক করেছি।
তিনি বলেন, দীর্ঘসময় পর আমরা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি।আমরা যদি এলাকা নিয়ন্ত্রনে রাখি আর তারা ভিতরে লুকায়, তাহলে যেখানেই থাকুক না কেন আজ বা কাল ধরতে পারব। তারা ভিতরে থাকলে পালাতে পারবে না।
অভিযান সফল দাবি করে তিনি বলেন, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।সাংবাদিকদের নিয়মিত যাওয়ার আহ্বান জানান। বলেন, আমরাও আছি সেখানে। প্রশাসনের কোন ত্রুটি থাকলে বলবেন।
প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা :
অভিযান শেষে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে সরকারের কিছু পরিকল্পনা আছে। পরিকল্পনাটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা যে প্রতিবন্ধকতাটা বোধ করছিলাম এতদিন তা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় সেই প্রতিবন্ধকতা থেকে আমরা মুক্ত হলাম।
তিনি জানান “সরকার যেসমস্ত পরিকল্পনা পূর্বে গ্রহণ করেছিল এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নের যেসমস্ত পরিকল্পনা ভবিষ্যতেও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সেগুলোর জন্য পথ উন্মুক্ত হলো। যেসব পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা এখন নিয়মিতভাবে কাজ করে যাব।”
অভিযান চালাতে এত দেরি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “মাঝখানে নির্বাচন পরিচালনার কাজ ছিল। এর পরপরই এই যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা হল। সমস্যা দূরীভূত হয়ে সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল।”
এর আগে ২০২২ সালে এই খাস জমি দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
তখন উচ্ছেদ অভিযানে বারেবারে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টানা উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট’ বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, শহরের কেন্দ্রে এত বড় একটা সরকারি জমি দুয়েকজন মানুষের হাতে জিম্মি থাকতে পারে না, “কারাগার, চিড়িয়াখানাসহ যা যা পরিকল্পনা ছিল সেগুলো দ্রুত সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দরকার।
ডিআইজি আরো বলেন, এই অভিযানের মাধ্যমে এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক দুর্বল করা এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অভিযান শেষে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে জেলা পুলিশ ও এপিবিএন এর মোট ১৩০ জন সদস্য এবং আলী নগর উচ্চ বিদ্যালয় আরআরএফ, এপিবিএন এবং র্যাব ৭এর মোট ২৩০ জন সদস্য রয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট ও পুলিশি টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের ফলে স্থানীয় জনসাধারণের নিকট স্বস্তি ফিরে এসেছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
Leave a Reply