
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ও শাস্তি সম্পর্কিত দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি রাজিক–আল–জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩১ আগস্ট এই আদেশ প্রদান করেন। সম্প্রতি এই চার পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ আদেশটি প্রকাশিত হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এই রিটটি করেছিলেন। রিট আবেদনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৬ ধারার সঙ্গে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারাকে অসাংবিধানিক ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করার আরজি জানানো হয়েছিল। রিটকারীর দাবি ছিল, রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধানটি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন, তিনি এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। আদালতে রিটকারী নিজেই শুনানি পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা মমতাজ।
আদালতের পূর্ণাঙ্গ আদেশে দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা ও সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেছেন, সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে এসব অধিকার ভোগ করার সুযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা কি সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ কি না?
আদেশে বলা হয়েছে, দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারার ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে বলা আছে—সরকারের প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কার্যক্রমের প্রতি অসম্মতি প্রকাশ করে মন্তব্য করা হলে এবং এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা বা অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা না থাকলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। এই আইনি ব্যাখ্যাটি আদালত পর্যালোচনায় রেখেছেন। ১২৪ক ধারার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি যদি কথার মাধ্যমে, তা মৌখিক বা লিখিত যেভাবেই হোক, অথবা কোনো চিহ্ন, দৃশ্যমান উপস্থাপনা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা সৃষ্টি করে বা সৃষ্টির চেষ্টা ক।
হাইকোর্টের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারার কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত বাক্স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রিটকারী উত্থাপন করতে পারেননি। এছাড়া এই ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারের কোনো পদক্ষেপ কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে, এমন কোনো উদাহরণও রিটে দেওয়া হয়নি। আবেদনটির সারবত্তা না থাকায় আদালত তা সরাসরি খারিজের সিদ্ধান্ত দেন।