
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি শুধু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নয়, ব্যবসায়িক সাফল্য দিয়েও নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রেকর্ড ভাঙা, শিরোপা জয় এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি ইউরোপের পর্যটন শিল্পে বিলাসবহুল হোটেল ব্যবসা গড়ে তুলে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা।
বর্তমানে স্পেন ও অ্যান্ডোরাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছয়টি অভিজাত বুটিক হোটেলের মালিক মেসি। ‘এমআইএম হোটেলস’ নামে পরিচালিত এই হোটেল চেইন এখন ইউরোপের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর অন্যতম আকর্ষণ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীরা শুধু ভ্রমণের জন্যই নয়, মেসির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অনুভূতি পেতেও এসব হোটেলে অবস্থান করতে আগ্রহী।
মেসির মালিকানাধীন হোটেলগুলো এমন সব স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের কাছে আগে থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে বার্সেলোনার উপকূলীয় শহর সিটজেস, ভূমধ্যসাগরের বিখ্যাত দ্বীপ ইবিজা, শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত মায়োর্কা, পিরেনিজ পর্বতমালার পর্যটনকেন্দ্র বাকেইরা, অ্যান্ডোরা এবং আন্দালুসিয়ার সোটোগ্রান্দে। প্রতিটি হোটেলই নিজস্ব পরিবেশ, নকশা ও সেবার কারণে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে।
বার্সেলোনা থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থিত এমআইএম সিটজেস আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ৭৭টি কক্ষ নিয়ে গড়ে ওঠা এই হোটেলটি অবকাশযাপনকারীদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয়। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত এমআইএম ইবিজা বিলাসবহুল পরিবেশের জন্য সুপরিচিত। এখানে এক রাতের কক্ষভাড়া শুরু হয় প্রায় ৬০০ ইউরো থেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০ হাজার টাকার সমান।
যারা নিরিবিলি পরিবেশে ছুটি কাটাতে চান, তাদের জন্য রয়েছে এমআইএম মায়োর্কা। আবার শীতকালীন পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র এমআইএম বাকেইরা, যা স্পেনের বিখ্যাত পিরেনিজ পর্বতমালায় অবস্থিত। স্কি মৌসুমে এই হোটেলে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
অ্যান্ডোরার কার্লেমানি অ্যাভিনিউতে অবস্থিত পাঁচতারকা এমআইএম অ্যান্ডোরা তার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ধাঁচের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। অন্যদিকে এমআইএম সোটোগ্রান্দে একটি নৌ-থিমভিত্তিক বুটিক হোটেল, যেখানে অবস্থান করেই উপভোগ করা যায় ভূমধ্যসাগরের মনোরম দৃশ্য।
যদিও হোটেলগুলোর দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে স্পেনের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘মেলিয়া হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল’, তবুও সবকটি হোটেলের মালিকানা রয়েছে লিওনেল মেসির প্রতিষ্ঠানেই। ‘দ্য মেলিয়া কালেকশন’-এর অধীনে পরিচালিত এই হোটেলগুলো আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিয়ে ইতোমধ্যেই পর্যটকদের আস্থা অর্জন করেছে।
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এমআইএম হোটেলসকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে মেসির ব্যক্তিগত উপস্থিতির নানা ছাপ। কয়েকটি হোটেলে রয়েছে বিশেষ ‘লিও মেসি সুইট’, যেখানে অতিথিরা মেসির ক্যারিয়ারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা উপাদানের ছোঁয়া অনুভব করতে পারেন। এছাড়া লবি ও নির্দিষ্ট প্রদর্শনী এলাকায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে তার জেতা ব্যালন ডি’অর ট্রফির প্রতিরূপ, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।
আবাসনের পাশাপাশি রসনাবিলাসীদের কথাও ভেবেছেন মেসি। বাকেইরা, অ্যান্ডোরা ও সোটোগ্রান্দের হোটেলগুলোতে রয়েছে ‘হিনচা’ নামের বিশেষ রেস্তোরাঁ। মিশেলিন তারকাপ্রাপ্ত স্প্যানিশ শেফ নান্দু জুবানির সহযোগিতায় পরিচালিত এই রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয় আন্তর্জাতিক মানের খাবার। এখানকার সবচেয়ে আলোচিত ডেজার্টের নাম রাখা হয়েছে ‘ব্যালন ডি’অর’, যা মেসির কিংবদন্তি ক্যারিয়ারের প্রতি সম্মান জানিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া কিছু হোটেলে অতিথিদের জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত রুফটপ জাকুজি, আধুনিক ওয়েলনেস স্পা এবং উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা।
হোটেল ব্যবসার বাইরেও মেসি নিজের বিনিয়োগের পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন। ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি রিয়েল এস্টেট, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে অংশীদারত্ব, মিডিয়া, প্রযুক্তি খাত, পোশাক শিল্প এবং ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাতেও বিনিয়োগ করেছেন। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে গড়ে তোলা এই বহুমুখী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তাকে মাঠের বাইরেও আর্থিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, মাঠে যেভাবে মেসি ধৈর্য, পরিকল্পনা ও সাফল্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন, ব্যবসায়ও সেই একই দূরদর্শিতা কাজে লাগাচ্ছেন। ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি প্রমাণ করেছেন, মাঠের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন অনেক আগে থেকেই। ফলে লিওনেল মেসি এখন শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও বিশ্বজুড়ে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করে তুলছেন।
সূত্র: এনডিটিভি