
আমাদের বন ও পাহাড়ের সুদর্শন বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত চালমুগরা বা ডালমুগরি এখন মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম ও আইইউসিএন-এর প্রকাশিত রেড লিস্টে গাছটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথমবার গাছটি দেখার পর, পরবর্তী সময়ে খাগড়াছড়ির আলুটিলা ডাউনের প্রাকৃতিক আবাসে এর দেখা মেলে। তবে সে সময় এর বিপন্ন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা ছিল না। রেড লিস্টে মহাবিপন্নতার তথ্য দেখে আবার গাছটির কথা মনে পড়ল।
দেশের বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই গাছের দেখা পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ১০টি স্থানে প্রাকৃতিক আবাসে গাছটি টিকে আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, প্রতিটি স্থানে মাত্র ১ থেকে ৩টি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্লেষণ বলছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে এখন এই উদ্ভিদের সংখ্যা ১০০-এর নিচে নেমে এসেছে। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে ৫টিরও কম উদ্ভিদ টিকে আছে, যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সূচকের চেয়ে অনেক কম। এর দ্রুত বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বীজের অত্যধিক আহরণ, কারণ এর তেল কুষ্ঠ ও অন্যান্য চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হারও অত্যন্ত সীমিত। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে এই সংখ্যা ৫-এর নিচে; যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। শরীরের কোথাও চুলকানি বা চুলকানির কারণে শরীর লাল হয়ে ফুলে গেলে চালমুগরার তেল চুলকানির স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যাবে।
চালমুগরা (Hydnocarpus kurzii) হলো একটি চিরসবুজ মাঝারি আকারের গাছ, যা ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর কাণ্ড সোজা ও গোলাকার। বাকল পুরু, মসৃণ এবং সবুজাভ ধূসর বর্ণের হয়। গাছটির পাতা পুরু ও ভল্লাকার। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা ঋতুতে হালকা হলুদ রঙের সুগন্ধি ফুল ফোটে এবং হেমন্তকালে ফল পরিপক্ব হয়। গোলাকার শক্ত ও বাদামি রঙের ফলের ভেতরে কয়েকটি বীজ থাকে। এটি মূলত আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। দিনে ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে এটি ভালো জন্মে। পাতা পুরু, ভল্লাকার বা আয়ত ভল্লাকার, আগা সুচালো, কিনারা সমান, তবে পাতার দুই পাশ ঢেউখেলানো। পূর্ণ সূর্যালোক এবং হালকা ছায়াযুক্ত স্থানও পছন্দ। প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে; তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-পলিযুক্ত সমতল ভূমি অথবা আর্দ্র কিন্তু সুনিষ্কাশিত পরিবেশেও ভালো বৃদ্ধি পায়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতে গত ১০ বছরে এই প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় চাষাবাদ হলেও প্রাকৃতিক উৎস থেকে গাছ সংগ্রহের প্রবণতা কমেনি। স্থানীয়ভাবে বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়ি, কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা, খাগড়াছড়ির আলুটিলা, রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং, পাবলাখালী এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলে গাছটি দেখা যায়। সম্প্রতি কিছু স্থানে নতুন করে গাছ রোপণ করা হচ্ছে।
ঔষধি গুণের ভাণ্ডার এই চালমুগরা নানা রোগে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। চুলকানি বা ত্বকের সমস্যায় এর তেল সরাসরি ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। আমাশয় নিরাময়ে পাতা সেদ্ধ পানি পান করা উপকারী। খুশকি দূর করতে চুলে তেল দিয়ে আধা ঘণ্টা রাখার পর ধুয়ে ফেলতে হয়। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে গরম পানির সঙ্গে ১ গ্রাম বীজগুঁড়া সেবন করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া খোসপাঁচড়া বা ঘায়ের চিকিৎসায় মৌচাকের মোম ও চালমুগরা তেলের মলম কার্যকর। চীন ও আর্জেন্টিনায় এই তেল ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। কুষ্ঠরোগে চালমুগরার বীজতেল গরম করে সকাল–বিকেল খেলে উপশম হয়। মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।