
‘কেউ অস্ত্র চালাতে পারলে তাদের অস্ত্র দেয়া হবে। যেকোনো মূল্যে ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন থামাতে হবে।’ এমন ঘোষণা দিয়ে মিরপুর ও মোহাম্মাদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার শত শত যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। যারা অস্ত্র পেয়েছিল তাদের বেশিরভাগ মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরাও অস্ত্র পেয়েছেন। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরবর্তী সময় সেসব অস্ত্র ব্যবহার করেই বিভিন্ন থানায় হমালা ও লুটপাট চালানো হয়। প্রতিটি থানা থেকে শত শত অস্ত্র লুট করা হয়। এরপর থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে রাজধানী। হঠাৎ বিভিন্ন এলাকায় থেকে ডাকাতির খবর পাওয়া যায়। মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে পুরো ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে ডাকাত আতঙ্ক। রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্থানে ডাকাতিকালে জনতার হাতে আটক কয়েকজন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নাম সামনে এসেছে। এরমধ্যে গত ৮ আগস্ট মিরপুরের কালশীতে ডাকাতির সময় জনতার হাতে আটক হন দু’জন। পল্লবী থানা ছাত্রলীগ নেতা জুনায়েদ নাহিদের নির্দেশে তারা হাতে অস্ত্র নিয়ে বের হয়েছে বলে স্বীকারোক্তি দেয়।
সূত্র বলছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রতিরোধ করতে রাজধানীর মিরপুর ও মোহাম্মাদপুরের ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক এমপি ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু, ঢাকা উত্তরের ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা, ডিএনসিসির ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন, একই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আওয়ামী লীগ নেতারা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন ফারহান লামিদ। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস বিইউপি’র শিক্ষার্থী। তিনি জানান, আন্দোলনের শেষ দু’দিন পুলিশ ও বিজিবি তেমনভাবে গুলিবর্ষণ করেনি। এ দু’দিন ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকশ’ নেতাকর্মী। দিনে দুপুরে তারা হাতে পিস্তল নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালালেও প্রশাসন নীরব ছিল। গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে থাকলেও কেউ ছবি তুলেননি ও ভিডিও করেননি।
অনুসন্ধান বলছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের দেওয়া ও থানা থেকে লুট করা অস্ত্র ব্যবহার করেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর রাত ১০টায় মিরপুর ১০ নম্বরে মো. রুবেল হোসেন নামের এক যুবককে ছররা গুলি ছুড়ে হত্যা করা হয়। একই এলাকায় মো. ডলার নামের এক যুবকের হাতেও পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়। সেই যুবকের হাত কেটে ফেলতে হবে বলে পরিবারকে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
গুলিবিদ্ধ মো. ডলার বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মাদপুরের শ্যামলী টেককেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাত ১০টায় মিরপুর ১০ নম্বরে সবাই স্বৈরাচার হাসিনার পতনে বিজয় উল্লাস করছিল। তখন আমি জুটপট্রির একটি মাংসের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখানে মাদক ব্যবসায়ী মফিজের ছেলে আলি ও হাসান এবং এলাকার মাদক ব্যবসায়ী কুরবান, সাগর, মফিজের মেয়ের স্বামী হাসান হঠাৎ করে শর্টগান নিয়ে আসে। আমার খালাতো ভাই রুবেলকে ক্যাম্পের গলি থেকে দৌড়াইয়া গুলি করে। এরপর ‘ তুই সাক্ষি দিছিলি না’ বলেই শর্টগান দিয়ে আমার হতে গুলি করে। আমি বেঁচে গেলেও আমার ভাই ঘটনাস্থলে মারা যায়। এরপর স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে তারা পালিয়ে যায়। তবে আমার পরিবারের সবাইকে হত্যা করবে বলে হুমকি দেয় তারা।’
মিরপুর ১০ নম্বরের স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসিফ ইকবাল জানান, ‘মফিজ ও তার ছেলেরা এলাকায় মাদক ব্যবসা করে। ছাত্রআন্দোলন থামানোর জন্য তারা যুবলীগ নেতা নিখিল ও বাপ্পীর সাথে মাঠে ছিল। তারা অস্ত্রও পেয়েছিল। সরকার পতনের পর তারা মিরপুর থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুটপাট করে। সেসব অস্ত্র ব্যবহার করেই তারা এসব অপকর্ম করছে।’

সূত্র বলছে, পল্লবীতে শুধু মাদক ব্যবসায়ী নয়, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মী-সমর্থকরাও শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়েছিলেন ছাত্রদের আন্দোলন মোকাবিলায়। যারা অস্ত্র পেয়েছেন তারা হলেন, পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা, পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি জুনায়েদ নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক আবিরসহ কমপক্ষে ৪০-৫০ জন যুবক।
তিনি বলেন, ডলার মাদক ব্যবসায়ী মফিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিল। এজন্য তাকে গুলি করেছে। তবে ডলারের খালাতো ভাই রুবেল সবজি বিক্রেতা। তাকে বিনা কারণে গুলি করে হত্যা করেছে।
মোহাম্মাদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাজু। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডিএনসিসির ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন ও একই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা আন্দোলনের শেষের দিকে জেনেভা ক্যাম্পের অনেক মাদক ব্যবসায়ীদের অস্ত্র দিয়েছিলেন। অস্ত্র প্রাপ্ত মাদক ব্যবসায়ী ও যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতারাই এসব এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর পর সেই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেই মোহাম্মদপুর থানায় হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। পরে সেই অস্ত্রগুলো ব্যবহার মাদক ব্যবসায়ীরা জেনেভা ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় অপতৎপরতা চালাচ্ছে। প্রতিদিনই মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে।
গত ৬ আগস্ট জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসায়ীদের তিনটি পক্ষে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মো. বাদশাহ (২৯) নামে এক তরুণ। জাম্বু কলিমের ছোড়া ছররা গুলিতে তার মৃত্যু হয় বলে নিহতের স্বজন জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেনেভা ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, ছাত্রআন্দোলন থামাতে মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে অস্ত্র দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও কাউন্সিলর রাষ্ট্রন। সেই অস্ত্র তারা থানায় হামলার সময় ব্যবহার করে। এখন ওইসব অস্ত্র দিয়েই প্রতিপক্ষকে গুলি করছে তারা। কেউ কেউ ছিনতাই ও ডাকাতিও করছে।
সূত্র:দ্য নিউজ