
আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ চাপে রয়েছে বিজেপি। বিধান পরিষদের নির্বাচনে দলের ভরাডুবি এবং শরিক দলগুলোর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরাসরি আসরে নেমেছেন। শুক্রবার লক্ষ্ণৌতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার আড়াই হাজার দলীয় নেতার সঙ্গে এক সম্মেলনে যোগ দিয়ে শাহ তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দলীয় নেতাদের মনে থাকা মান-অভিমান, ক্ষোভ কিংবা প্রাপ্তির অতৃপ্তি এখন গোমতী নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে সামনে তাকাতে হবে। এতে মনে ক্ষোভ বা হতাশা জন্মাতেই পারে। কিন্তু দলের স্বার্থে এখান থেকে বেরোনোর পর তা গোমতীর জলে বিসর্জন দিন। বিধান পরিষদের ভোটে তার একটা প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ অবস্থায় দলীয় অসন্তোষ দূর করতেই অমিত শাহকে তৎপর হতে হয়েছে। অথচ ২০১৭ সালে ক্ষমতাসীন হয়েও উত্তর প্রদেশে বিজেপি ওই রাস্তায় হাঁটেনি। অখিলেশের প্রতি দলের অনেকেই ঝুঁকতে চাইছেন। জয়ন্ত চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় লোকদল ২০২২ সালের ভোটে অখিলেশের সঙ্গে জোট বেঁধে ৮টি আসন জিতেছিল।
অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেন, কোনো একক নেতার পক্ষে সবাইকে নির্বাচনে জেতানো সম্ভব নয়, জয়ের মূল চাবিকাঠি থাকে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের হাতেই। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের নির্বাচনী এলাকা বারানসির দুটি আসনেই বিধান পরিষদের নির্বাচনে বিজেপি হেরেছে। শুধু তা-ই নয়, সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ এবং আগ্রার আসনগুলোতেও জয় পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন মূলত শিক্ষক ও স্নাতকেরা, আর এই শিক্ষিত অংশের বিজেপি বিমুখতা দলটির নেতৃত্বের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। শাহ বলেন, কোনো নেতাই একা সবাইকে জেতাতে পারেন না। বিধানসভার ভোটের আগে এসপির এই ৫ আসনে জয় বিজেপির দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এই জন্য যে এবারের ভোটাররা ছিলেন শুধু শিক্ষক ও স্নাতকেরা। অর্থাৎ ওই ৫ আসনের শিক্ষিত ভোটাররা বিজেপিকে ত্যাগ করেছেন। এবার ভোটের আগে দুই দলেই নতুন ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।
বিজেপি যখন তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে, তখন দলের অন্দরে সৃষ্ট এই সংকট ও ক্ষোভ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় সূত্রে খবর, সম্প্রতি রাজ্যের ১১টি রাজ্যসভা আসনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুরোনোদের বাদ দিয়ে নতুনদের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। শাহের এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল সেই ক্ষোভ প্রশমিত করা এবং হারের কারণগুলো বিশদভাবে খতিয়ে দেখা।
নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা আবারও সামনে এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাজ্যে পুনরায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) কার্যকর করা হবে। উল্লেখ্য, উত্তরাখন্ডে ইতিমধ্যেই ইউসিসি চালু হয়েছে এবং গুজরাট, আসাম ও মধ্য প্রদেশ বিধানসভায় বিল পাস হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানেও এই প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে। শাহের লক্ষ্য ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে এই আইন চালু করা।
বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবকে আক্রমণ করে অমিত শাহ দাবি করেন, পরবর্তী ৩০ বছরেও এসপি ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না এবং সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। জবাবে অখিলেশ যাদব পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, গত ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও কেন বিজেপি ইউসিসি কার্যকর করতে পারল না? তিনি আরও বলেন, স্রেফ ফাঁকা বুলি দিয়ে নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়, যার প্রমাণ বিধান পরিষদের ফলাফলই দিচ্ছে। জনগণ আপনাদের তৃতীয় প্রজন্মদেরও ক্ষমা করবে না।
উত্তর প্রদেশে এনডিএর শরিক দলগুলোর পরিস্থিতিও বেশ জটিল। পরে জোটত্যাগ করে আরএলডি এনডিএর শরিক হয়।
নিষাদ পার্টি এবং সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি শুরু থেকেই বিজেপির সঙ্গে ছিল, কিন্তু এখন তাদের মধ্যে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। কেননা, ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার পুরোভাগে রয়েছে শিক্ষিত যুব সমাজ। নিষাদ পার্টি জেতে ১১ আসনে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি পেয়েছিল ৬টি আসন।
নিষাদ পার্টির নেতা সঞ্জয় নিষাদ সম্প্রতি এনডিএর প্রতি প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বিকল্প পথের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসাথে সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির অভ্যন্তরেও বিদ্রোহ ও দলত্যাগের ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, পশ্চিম উত্তর প্রদেশের জাট ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রীয় লোকদলের প্রধান জয়ন্ত চৌধুরী বর্তমানে বিজেপির শরিক হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকলেও, তাঁর আগামী দিনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে।