
একটি সেতু ভেঙে পড়ে আছে টানা ২৩ বছর। অর্ধেক অংশ নদীগর্ভে বিলীন, অবশিষ্ট অংশও মাঝ বরাবর দেবে গিয়ে পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। অথচ বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় সেই ভাঙা সেতুই প্রতিদিন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ গ্রামের হাজারো মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঠের নড়বড়ে সাঁকো আর ভাঙা পাটাতন পেরিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, নারী, কৃষক ও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর ভেঙে যাওয়া অংশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্মিত কাঠের সাঁকোটি এখন প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী। পচে যাওয়া পাটাতনে বড় বড় ফাঁক, হেলে পড়েছে পিলার। সামান্য অসাবধানতায় পা আটকে দুর্ঘটনা ঘটছে। সাঁকো পার হয়ে মূল সেতুতে উঠতেই দেখা যায় আরও ভয়াবহ দৃশ্য—মাঝ বরাবর ঢালাই পাটাতন ভেঙে দেবে গেছে। সেখানে বাঁশ ধরে খাড়া অংশ বেয়ে ওঠানামা করতে হয়। বৃষ্টির সময় পিচ্ছিল হয়ে গেলে চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে বেরুবাড়ী ইউনিয়নের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বেরুবাড়ীর ছড়াটি একসময় দুধকুমার নদীর শাখা ছিল। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের পর এটি ছড়ায় পরিণত হলেও বর্ষা মৌসুমে দুধকুমারের পানিতে আবারও ভয়ংকর রূপ নেয়। তখন চরম দুর্ভোগে পড়েন আশপাশের গ্রামের মানুষ।
১৯৯৪ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাহেজের ঘাটে সেতুটি নির্মাণ করে। এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল মীরের ভিটা, চর বেরুবাড়ী, মাস্টারপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সবুজপাড়া, আকন্দপাড়া, হাজীপাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, চর রহমানের কুটি, মাদারগঞ্জ, জালির চর, কাইয়ের চর, শোলমারীসহ অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষ।
কিন্তু ২০০৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় দুধকুমারের তীব্র স্রোতে সেতুর পশ্চিমাংশ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর প্রায় এক দশক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ওই এলাকার সড়ক যোগাযোগ। ২০১৩ সালে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মোত্তালেব ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করে সাময়িক চলাচলের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবহারে সেটিও এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অভিভাবকরা আতঙ্কে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে চান না। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। রাতের বেলায় কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্ন। কৃষকরাও সময়মতো কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চর বেরুবাড়ীর বাসিন্দা আবেদ আলী, মোহাম্মদ আলী, আয়নাল হক ও মোহাম্মদ আলী বলেন, “সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু আমাদের দুর্ভোগের শেষ হয় না। একটি সেতুর জন্য বছরের পর বছর আবেদন করেও কোনো সুফল পাইনি।”
মীরের ভিটার সাফিউল বলেন, “ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায়। অনেক বৃদ্ধ সেতুর কাছে এসে ফিরে যান। আমরা যেন উন্নয়নের বাইরের মানুষ।”
মণ্ডলপাড়ার জিয়ারুল ইসলাম বলেন, “রাতে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় রোগীকে কাঁধে করে ভাঙা সেতু পার করতে হয়।”
বেরুবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোলায়মান আলী বলেন, “সেতুটি নির্মাণের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ প্রয়োজন।”
উপজেলা প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, “বর্ষা মৌসুম শেষে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নাগেশ্বরীর সাবেক ইউএনও এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, তিনি অল্প সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই সেতুটির বিষয়ে তাঁর জানা ছিল না।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত একটি নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।”
২৩ বছর ধরে একটি ভাঙা সেতুর ওপর নির্ভর করে হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও আজও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আর কত দুর্ঘটনা, আর কত বছরের অপেক্ষার পর মিলবে একটি নিরাপদ সেতু?