
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী শতকোটিপতিদের নিট সম্পদের ওপর ৫ শতাংশ এককালীন কর আরোপের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যসেবা খাতে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি মেটানো। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই করের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি ডলার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা এই প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে তাঁদের রায় প্রদান করবেন। একদিকে বিপুলসংখ্যক শতকোটিপতিদের বসবাস, আরেকদিকে গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও এই অঙ্গরাজ্য সবচেয়ে বেশি। এই ঘাটতি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে প্রস্তাবটি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাঁদের মধ্যে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন ৪ হাজার ৫১২ জন।
এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত যেসব ব্যক্তির নিট সম্পদ অন্তত ১০০ কোটি ডলার, তাঁদের ওপর এই কর ধার্য করা হবে। এতে অঙ্গরাজ্যটির অন্তত ২০০ জন শীর্ষ ধনী ব্যক্তি করের আওতায় পড়বেন। বিশ্বের প্রযুক্তি ও বিনোদন জগতের অনেক পরিচিত মুখ—যেমন মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন, নির্মাতা জর্জ লুকাস এবং কিম কার্ডাশিয়ানের মতো তারকারা এই রাজ্যের বাসিন্দা। প্রযুক্তি, বিনোদন ও অর্থনীতির বড় কেন্দ্র এই অঙ্গরাজ্য। তাঁদের মধ্যে আছেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন, বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল, উবারের সাবেক প্রধান নির্বাহী ট্রাভিস কালানিক ও ব্যবসায়ী ডন হ্যাংকি।
প্রস্তাবটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন-ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়েস্টের কর্মকর্তা সুজান জিমেনেজ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এটি একটি জরুরি পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত নীতির ফলে কেন্দ্রীয় অর্থায়ন কমে যাওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতেই এই অর্থ প্রয়োজন। তবে এর বিরোধিতায় রয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসমসহ প্রযুক্তি খাতের অনেক উদ্যোক্তা। তাঁদের দাবি, এই করের ফলে সম্পদশালীদের অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় কমিয়ে দিতে পারে। তাঁর মতে, নতুন উদ্যোগ নেওয়া না হলে অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি আছে।
ইতিমধ্যে ডন হ্যাংকিসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের মতো ধনকুবের ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে থেকেই মার্ক জাকারবার্গ ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে স্থায়ী আবাস গড়ার চিন্তাভাবনা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। জাকারবার্গের ২০০ বিলিয়ন ডলার সম্পদের ওপর যদি এই কর কার্যকর হয়, তবে তাঁকে প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার কর পরিশোধ করতে হতে পারে। যদিও সব ধনী ব্যক্তি এই প্রস্তাবের বিরোধী নন, যেমন জেনসেন হুয়াং এবং টম স্টেয়ার সম্পদকরের পক্ষে রয়েছেন। আবার সের্গেই ব্রিন প্রস্তাবটি ঠেকানোর প্রচারণায় ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানিয়েছে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তাঁর করের দায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবিত করের কারণে তাঁকে এই রাজ্য ছাড়তে হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের গবেষণা বলছে, সম্পদকরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে করের কাঠামো, ছাড়ের সুবিধা এবং ধনীদের কর ফাঁকির প্রবণতার ওপর। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই করের প্রভাব নিয়ে বার্কলি ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস যৌথভাবে একটি জরিপ চালিয়েছে। ১৫ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের ওই জরিপে ৬ হাজার ৯৮৯ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৪৫ শতাংশ প্রস্তাবের পক্ষে এবং ৪২ শতাংশ বিপক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ১৩ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্পদকর থেকে কত রাজস্ব আদায় হবে, তা নির্ভর করে করের কাঠামো, ছাড়, কর ফাঁকি ও করদাতাদের আচরণের ওপর। এ ধরনের কর ধনীদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করতে পারে, তবে এর প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন। সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন ১৩ শতাংশ ভোটার।