
কোনো লিখিত চুক্তি নয়, কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও নয়—তবুও চার দশক ধরে টিকে ছিল এক বিরল সমঝোতা। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনীরপাঠ বাজার ছিল সেই সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক, যেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে গরুর মাংস বিক্রি হয়নি—শুধু পারস্পরিক সম্মান আর ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কারণে।
কিন্তু সাম্প্রতিক এক ঘটনায় সেই নীরব ঐক্যে দেখা দিয়েছে চিড়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় চার দশক আগে ব্যক্তি উদ্যোগে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। তখন এটি ছিল ছোট্ট একটি হাট। ধীরে ধীরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা এখানে দোকানপাট গড়ে তোলেন।
তবে শুরু থেকেই একটি শর্তে একমত হয় দুই সম্প্রদায়—বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হবে না। কারণ বাজারের মাঝখানেই রয়েছে একটি কালীমন্দির, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুরোধ ছিল—মন্দিরের সামনে যেন গরু জবাই না করা হয়। মুসলিম সম্প্রদায় সেই অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে তা মেনে নেয়।
এভাবেই গড়ে ওঠে সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা টিকে ছিল সরকার পরিবর্তনের বহু অধ্যায় পেরিয়েও।
গত ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সেই দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়ম ভেঙে বাজারে একটি গরু জবাই করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল হক।
এই একক ঘটনাই যেন নাড়িয়ে দেয় পুরো এলাকার সামাজিক ভারসাম্য। শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা, সামাজিকমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া, আর স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি।
আজিজুল হকের ভাষ্য, সময়ের বাস্তবতায় এখন মুসলিমদের সংখ্যা বেশি এবং বাজারে গরুর মাংসের চাহিদাও রয়েছে। তার দাবি, হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আপত্তি নেই। বরং কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টি উসকে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলছেন, “স্বাধীনতার পর থেকে এখানে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধ হয়নি। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই, কোনো অশান্তি চাই না।”
স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন স্মরণ করিয়ে দেন, “বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা আওয়ামী লীগ—কোনো আমলেই এই বাজারে গরু জবাই হয়নি। আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে এই রীতি চলে আসছে।”
বাজারের কেন্দ্রস্থলে থাকা কালীমন্দিরকে ঘিরেই মূলত এই সমঝোতার জন্ম। মন্দির কমিটির সদস্য কাঞ্চন কুমার বর্মন জানান, “মুসলিম ভাইদের অনুরোধেই এখানে বাজার গড়ে ওঠে। আমরা শুধু বলেছিলাম, মন্দিরের সামনে গরু জবাই না করতে—তারা সেটি মেনে নিয়েছে এতদিন।”
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিতাই রায় বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে বাধা নেই, কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার অনুরোধ থাকবে।”
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে গত ৭ এপ্রিল থানায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—আগের মতোই বাজারে গরু জবাই বন্ধ থাকবে এবং পুরনো প্রথা বজায় রাখা হবে।
নাগেশ্বরী থানার ওসি আব্দুল্লাহ হিল জামান জানান, বাজার কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সম্প্রীতি বজায় রাখতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে; এতে কোনো প্রশাসনিক চাপ ছিল না।
ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, “এই ঐতিহ্য শুধু একটি নিয়ম নয়, এটি দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক। এটি ভাঙার চেষ্টা সম্প্রীতির জন্য হুমকি।”
বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা রয়ে গেছে—এই ঘটনা কি সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে সহাবস্থানের ওপর?
ডাকনীরপাঠ বাজার এখন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—
ঐতিহ্য কি সময়ের চাপে বদলে যাবে, নাকি পারস্পরিক সম্মানের সেই পুরনো বন্ধনই আবার জোড়া লাগবে?
একটি বাজার, দুটি সম্প্রদায়, আর একটি সিদ্ধান্ত—যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও অনেক দূর পর্যন্ত।
Leave a Reply