
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো আরিফ হোসাইন শান্ত এর বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ী দম্পতিকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক পরিচয়ে মীমাংসার কথা বলে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল হাসান এর বিরুদ্ধে।
গত বুধবার রাত ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলার মোড় কাঁচাবাজারে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী দম্পতি আবদুস সালাম ও সীমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলার মোড় কাঁচাবাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী রাকিব মোল্লা সরকারি জায়গায় দোকান নির্মাণের অভিযোগ এনে কৈফিয়ত চাইতে ব্যবসায়ী সালামকে ডেকে নেন। এ সময় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্তসহ আরো কয়েকজন উপস্থিত হন। সালাম রাকিবের নিকট কৈফিয়ত দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তখন আরিফ শান্ত সরকারি জায়গায় দোকান নির্মাণের কারণ জানতে চান এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। এক পর্যায়ে আরিফ শান্তর সঙ্গে থাকা কয়েকজন সালামকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে এবং মারধরের চেষ্টা করে। পরিস্থিতি খারাপ হলে স্থানীয় লোকজন সালামকে সেখান থেকে সরিয়ে দেন।
এদিকে ঘটনার সময় বাজারে সবজি বিক্রি করছিলেন সালামের স্ত্রী সীমা বেগম। সালামের পর তখন সীমাকে সেখান থেকে ডেকে নেন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল হাসান।
ব্যবসায়ী সীমা বেগমের দাবি, ঝামেলা মীমাংসার কথা বলে এবং সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সাজিদসহ আরও দুজন তার কাছে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে স্বামী-সন্তানকে মেরে ফেলার এবং পরিবারকে এলাকা থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে নিজের কাছে টাকা না থসত্ত্বেও ধার করে তাৎক্ষণিক এক হাজার টাকা সাজিদকে দেন সীমা। পরে কোনো সমস্যা হলে যোগাযোগ করার জন্য সাজিদ একটি কাগজে নিজের নাম ও মোবাইল নম্বর লিখে দেন সীমাকে। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ওই নম্বরে যোগাযোগ করে সেটি সাজিদুল হাসানের বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় পরের দিন (বৃহস্পতিবার) রাত ১১ টার দিকে আরিফ শান্তসহ কয়েকজন সীমা বেগমের কাছে গিয়ে ভুল হয়েছে বলে ক্ষমা চান এবং ঘটনাটি গোপন রাখার অনুরোধ করেন।পরদিন (শুক্রবার) সন্ধ্যায় বসে বিষয়টি মীমাংসার আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি বলে জানান সীমা বেগম।
এদিকে সীমা বেগম আরো অভিযোগ করেন , ঘটনার সুষ্ঠুবিচার দাবি করায় ও সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করায় রবিবার ( ১২ জুলাই ) দুপুরে এই ব্যবসায়ী দম্পতিকে মারধর করে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় যুবদল কর্মী রাকিব মোল্লা ও তার সহযোগীরা।
ভুক্তভোগী সালাম বলেন, “দোকানটি ফায়ার সার্ভিসের জায়গায়। কয়েক বছর ধরে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নিয়ে জায়গাটি দেখাশোনা করছি এবং পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করছি। যেহেতু আমাকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না, তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ দোকান করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই দোকান দেওয়া নিয়ে আমাকে ডেকে হেনস্তা করা হয়। পরে আমার স্ত্রীর কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আমি ববি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছি, সামনের দুটি দাঁত হারিয়েছি, জেলও খেটেছি। অথচ আজ আমার সঙ্গেই এমন আচরণ করা হচ্ছে।”
সীমা বেগম বলেন, “আমার স্বামীর সঙ্গে ঝামেলার পর শান্ত তার লোক দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেয়। আমি তখন সবজি বিক্রি করছিলাম। সাজিদ নামের এক ছেলেসহ আরও দুজন আমাকে ডেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ৫ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে আমার স্বামী-সন্তানকে মেরে ফেলার এবং আমাদের বাড়িতে থাকতে না দেওয়ার হুমকি দেয়। বাধ্য হয়ে ধার করে এক হাজার টাকা দিই। টাকা দিতে গিয়ে পরের দিন আর সবজিও বিক্রি করতে পারিনি। আমরা গরিব মানুষ, কষ্ট করে খাই। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী রাকিব মোল্লা বলেন, “সরকারি জায়গায় দোকান দিয়ে সেটি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে কেন, শুধু এ বিষয়টি জানার জন্য আমি সালামকে ডেকেছিলাম। পরে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী জড়ো হয়। আমি কাউকে ফোন করে ডাকিনি। তারা নিজেরাই এসেছে বা আগে থেকেই সেখানে ছিল। পরে শুনতে পারি সালামের সাথে নাকি ঝামেলা হয়েছে ও টাকা নিয়েছে।কারা করেছে আমি জানি না।”
বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জায়গাটি ফায়ার সার্ভিসের। সেটি দেখাশোনার জন্য সালামকে সেখানে থাকতে বলা হয়েছে।কয়েকবছর যাবত সে ওখানে থাকে ,দেখাশোনা করে। এর জন্য তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য সেখানে দোকান করতে মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জায়গাটি নিয়ে কিছু দুষ্টু লোকের নজর পড়েছে। বিষয়টি আমাদের উর্ধতন কর্মকর্তারা অবগত হয়েছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল হাসান বলেন, “ ওনারা পাশের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। পাশের দোকানে আমি, শিমুল ও ইমরান বসেছিলাম। তারা বলছিলেন, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নিয়ে সেখানে থাকেন এবং দোকানঘর তুলেছেন, কিন্তু কিছু লোক তাদের বিরক্ত করছে। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না। পরে আন্টি আমাকে ছেলে সম্বোধন করে ভবিষ্যতে কেউ বিরক্ত করলে পাশে থাকতে বলেন। আমাকে চাও খাওয়ানো হয়েছে। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেই বিষয়টি জানা যাবে। এখন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সেখানে সিসি ক্যামেরাও রয়েছে, সেটি দেখলেই সব পরিষ্কার হবে।”
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত বলেন, বিষয়টিতে সাজিদ জড়িত আছে মর্মে ইতোমধ্যে সংবাদও হয়েছে। হঠাৎ করে আমার নাম আসছে কেনো? আমি সেখানে ছিলাম না। এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই।”