
লেবাননের খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়কে দেশটির অস্তিত্ব রক্ষার দুটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহাবস্থান বজায় রাখা ছাড়া দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যে কোনো এক পক্ষের অনুপস্থিতি লেবাননের বহুত্ববাদকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
বুধবার বৈরুতের অদূরে বাআবদা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচজন ফরাসি আইনপ্রণেতার সঙ্গে আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। আউন উল্লেখ করেন, লেবানন বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের বার্তা বহন করে। এই দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের মাধ্যমেই কেবল দেশের সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
ফরাসি প্রতিনিধি দলকে প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করে বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর পরিস্থিতির প্রভাব লেবাননের ওপর পড়তে দেওয়া হবে না। দেশটিতে খ্রিস্টানদের উপস্থিতি কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে নেই। তিনি আরও যোগ করেন, খ্রিষ্টান ডানা দুর্বল হলে চরমপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা পুরো ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে মুসলিম ডানা ছাড়া মধ্যপন্থা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খ্রিষ্টান ডানা হারালে সেখানে চরমপন্থা জায়গা করে নেবে, যা ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ‘ইউনিফিল’ (UNIFIL)-এর ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট আউন নতুন করে গুরুত্বারোপ করেছেন।
চলতি বছরের শেষভাগে বাহিনীটির ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ লেবাননে ইউনিফিলের উপস্থিতি বজায় রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি নতুন বাহিনী মোতায়েনের চিন্তাও করা হচ্ছে, যা অঞ্চলে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে যা ঘটেছে, তা লেবাননে ঘটতে দেওয়া হবে না।
তিনি মনে করেন, যুদ্ধ কখনোই দীর্ঘমেয়াদী ও নিরাপদ সমাধান বয়ে আনে না; এর একমাত্র পথ হলো কূটনৈতিক আলোচনা। গত আগস্টের শেষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার স্থবিরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
একই সফরে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জো রাজ্জিও ফরাসি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি বলেন, অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সরকারি উদ্যোগটি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে চাপে ফেলার জন্য নয়। এটি মূলত রাষ্ট্র গঠনের একটি জাতীয় পর্যায়, যার মাধ্যমে যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে রাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা হবে।
ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন এবং গত জুনে স্বাক্ষরিত লেবানন-ইসরায়েল কাঠামোগত চুক্তি বাস্তবায়নের জটিলতা এই আলোচনার মূল প্রেক্ষাপট। চুক্তি অনুযায়ী লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকা থেকে তাদের সরে আসার কথা থাকলেও তার বাস্তবায়ন এখনো অধরা। তবে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্জি দক্ষিণ লেবাননের খ্রিস্টান অধ্যুষিত গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের টিকে থাকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এইসব মানুষের তাদের নিজস্ব ভিটায় বসবাস নিশ্চিত করাই লেবাননের বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্য রক্ষার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং সহায়তা করা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।