
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারী উপজেলায় নানা সংকট ও অনিয়ম নিয়েই চলছে স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম। দুই উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ৫১৬ গ্রামের ৭ লক্ষাধিক মানুষের ৫০ শয্যা করে ১০০ শয্যার পৃথক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। ডাক্তার ও জনবল সংকটের পাশাপাশি অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও অকেজো যন্ত্রপাতি দিয়েই নামেমাত্র চলছে স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম।
উলিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছয় মাস ধরে অকেজো পরে আজে চারটি ইসিজি মেশিন। ডিজিটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রটির প্রিন্টারও অকেজো। একটি ইসিজি ও একটি এক্সরে মেশিন চালু থাকলেও তার ব্যবহার একেবারে সীমিত। বছর খানেক থেকে নেই সার্জারি চিকিৎসক ফলে বন্ধ রাখা হয়েছে সব ধরনের অপারেশন (ওটি) কার্যক্রম। এখানে গাইনি, শিশু ও মেডিসিন, নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। ১৬ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন এবং ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বিপরীতে একজন রয়েছেন। ৩৬টি নার্স পদের মধ্যে ৩৩ জন, ৫জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মধ্যে নিয়োজিত আছেন একজন। এ অবস্থায় উপজেলার ১টি পৌরসভা সহ ১৩ ইউনিয়নের ৩৫৮ গ্রামের ৬ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবা চলছে কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এজমাজনিত সমস্য নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি উপজেলার ধরণীবাড়ি ইউনিয়নের মাঝবিল গ্রামের লুৎফর রহমান (৬৭) জানান, গত ৫ দিন থেকে এখানে ভর্তি আছি। ডাক্তাররা ইসিজি করতে বলেছেন। কিন্তু হাসপাতালের ইসিজি যন্ত্র নষ্ট। এখন আল্লাহ ভরসা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পরিচর্যা ও সরবরাহকৃত খাবারের মান নিয়েও রয়েছে একাধিক অভিযোগ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মেহেরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটের কারণে রোগীদের সেবা পেতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, হাসপাতালে ১৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন এবং ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বিপরীতে ১ জন রয়েছেন। ওয়ার্ড বয়, আয়া, যন্ত্রপাতি, অ্যাম্বুলেন্সসহ সব পর্যায়ে সংকট রয়েছে। দৈনিক বহির্বিভাগে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন এবং অন্তঃবিভাগে প্রায় ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। ওয়ার্ড বয় জরুরি বিভাগে ফোঁড়া অপারেশন করতে পারে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে সার্জারি চিকিৎসক নেই তাই সব ধরনের অপারেশন বন্ধ আছে। অনেক সময় রোগীর অনুরোধে ছোট খাটো অপারেশন জরুরি বিভাগে হয়। তবে ওয়ার্ড বয় সেসব করে না। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
এদিকে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেষে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট। ছয়টি ইউনিয়নের ১৫৮ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল। এখনে ডাক্তার, নার্স, ঔষধ ও টেকনিশিয়ান সংকটের কারনে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। এ অবস্থায় সেবা নিতে আসা মানুষজন প্রতিদিন নানা হয়রানি ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালে ১৪৪টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৯২ জন। ২০ জন ডাক্তারসহ শূন্যপদ রয়েছে ৫২টি।অপরদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন থেকে বিকল পড়ে আছে। সম্প্রতি আবারো নতুন একটি এক্স-রে মেশিন আসলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় সেটির ব্যবহার হচ্ছে না।
জরুরি প্রসূতি সেবা কার্যক্রম যেখানে ২৪ ঘণ্টা চলার কথা, সেখানে চলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। বেশির ভাগ সময় জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম থাকে বন্ধ। ওই সময় জরুরি প্রসূতিসেবার জন্য রোগী আসলে চিকিৎসক এবং নার্সগণ তাকে স্থানীয় ক্লিনিকে প্রেরণের চেষ্টা করে থাকেন। এতে পরিবহনসহ অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। হাসপাতালের চারিদিকে ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি, বিদ্যুৎ চলে গেলে ভুতুরে পরিবেশসহ খাবারের মানও নিম্নমানের বলে অভিযোগ রয়েছে। চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আমি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু সাড়া মেলেনি। জনবল কম থাকলেও আমরা আন্তরিকভাবে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছি।’
Leave a Reply