
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনীরপাট বাজারে প্রায় চার দশক পর শুরু হয়েছে গরুর মাংস বিক্রি। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) জুমার নামাজের পর বাজারসংলগ্ন জামে মসজিদের সামনে ৬০০ টাকা কেজি দরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিক্রি শুরু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাজারটি গড়ে ওঠার পর থেকেই এখানে গরুর মাংস বিক্রি ছিল না। ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে এ প্রথা চালু ছিল। বাজারের কেন্দ্রস্থলে একটি কালীমন্দির থাকায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ বছর আগে ছোট পরিসরে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাটে পরিণত হলেও শুরু থেকেই মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা ছিল—মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় গরু জবাই ও গরুর মাংস বিক্রি করা হবে না।
এই সমঝোতা দীর্ঘদিন ধরে ‘সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।
সম্প্রতি ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বাজার এলাকায় গরু জবাই করলে দীর্ঘদিনের সেই নীরব সমঝোতায় চিড় ধরে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
এরপর দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা।
১২ এপ্রিল কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেন।
পরে ১৩ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বদরুজ্জামান রিসাদ এবং নাগেশ্বরী থানার ওসি আব্দুল্লাহ হিল জামানের উপস্থিতিতে স্থানীয় বিদ্যালয় মাঠে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
প্রাথমিকভাবে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত গরু জবাই ও মাংস বিক্রি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হলেও স্থানীয় একাংশ এতে আপত্তি জানায়।
পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল সকালে প্রশাসন সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাজারসংলগ্ন নির্ধারিত স্থানে গরুর মাংস বিক্রির অনুমতি দেয়। এরপর জুমার নামাজের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়।
স্থানীয় মাওলানা ফিরদাউস হাসান বলেন, “দীর্ঘদিন পর এখানে গরুর মাংস বিক্রি শুরু হলো। মানুষ তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পেয়েছে।”
ইউপি সদস্য গয়ানাথ সরকার বলেন, “দুই পক্ষের আলোচনা ও প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সমাধান হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।”
তবে স্থানীয় প্রবীণদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক সমঝোতা পরিবর্তন হওয়ায় ভবিষ্যতে এর প্রভাব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
নাগেশ্বরী থানার ওসি আব্দুল্লাহ হিল জামান বলেন, “স্থানীয়ভাবে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রশাসনের কোনো চাপ ছিল না।”
ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, “এটি শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের প্রতীক। সম্প্রীতি বজায় রাখা সবার দায়িত্ব।”
ডাকনীরপাটের এই ঘটনা গ্রামীণ সমাজে সহাবস্থান ও পরিবর্তিত বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, অন্যদিকে সময়ের চাহিদা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে টেকসই সমাধানের জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সহনশীলতার বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে ডাকনীরপাট বাজার এখন শুধু একটি বাজার নয়—এটি হয়ে উঠেছে পরিবর্তনশীল সমাজ বাস্তবতার এক প্রতীক।
Leave a Reply