
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে মোড় নিয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ থাকা জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মধ্যে লিমনের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহরকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।স্থানীয় সময় শুক্রবার ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের নিচ থেকে জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের সদস্যরা। লিমন ইউএসএফ’র ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী পিএইচডি গবেষক ছিলেন। তিনি জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে জলাভূমি পর্যবেক্ষণের ওপর কাজ করছিলেন। অত্যন্ত সহজ-সরল ও সদালাপী লিমনের স্বপ্ন ছিল পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে শিক্ষকতা করা।
লিমনের মরদেহ পাওয়া গেলেও তাঁর বান্ধবী ও সহপাঠী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বৃষ্টি রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগে পিএইচডি করছিলেন। লিমন ও সন্দেহভাজন হিশামের অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের বিপুল পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত বৃষ্টির পরিবারকে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বর্তমানে ডুবুরি দল ও ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রের পানিতে বৃষ্টির সন্ধান চালানো হচ্ছে।

লিমনের রুমমেট ও ইউএসএফ’র সাবেক শিক্ষার্থী হিশাম আবুঘরবেহরকে এই দ্বৈত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে হিশামের পারিবারিক বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ঘরের ভেতর ব্যারিকেড তৈরি করে অবস্থান নিলেও সোয়াত টিমের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন। এর আগে তাঁকে দুইবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও শুরুতে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন, কিন্তু পরে অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন।
অভিযোগ ও অপরাধীর অতীত:
স্টেট অ্যাটর্নির কার্যালয়ে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পর হিশামের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগেও হিশামের বিরুদ্ধে মারধর, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং মরদেহ গুম করার মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালেও তিনি পারিবারিক সহিংসতার দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর ভাই এবং মা তাঁর ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ এনে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি নিষেধাজ্ঞার আবেদনও করেছিলেন।
শোকাতুর প্রতিবেশি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া:
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় টাম্পা বে এলাকার বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইউএসএফ’র প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম এক শোকবার্তায় নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন এবং বৃষ্টির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। লিমনের বড় ভাই জুবায়ের আহমেদ আর্তনাদ করে বলেন, আমরা শুধু সত্যটা জানতে চাই। দুজন মেধাবী শিক্ষার্থী এভাবে হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে, তা অবিশ্বাস্য।
বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো এই দুই তরুণ গবেষকের এমন করুণ পরিণতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নিদারুণ হাহাকার ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে। লিমনের ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং বৃষ্টির সন্ধানের অপেক্ষায় এখন তাকিয়ে আছেন স্বজনরা।
Leave a Reply