
গত কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম উপজেলার ফসলী মাঠে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাতের আতঙ্ক আর ভারি বৃষ্টির মধ্যেও জমিতে আধাপাকা ধান কাটতে ছুটছে কৃষকরা। হাঁটু পানিতে নেমে পরিবারের সারা বছরের খাদ্য জোগানের জন্য ধান কেটে আনার চেষ্টা করছে কৃষাণ কৃষাণীরা। কোনো কোনো জমি হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে ফসলি জমি। এতে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে কৃষককুল। আরও এক সপ্তাহ পর ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে থাকে। বুধবারও দিনভর টানা বৃষ্টি হওয়ায় পানি আরও বেড়েছে। ঢলের পানিতে পাকা ধানের খেত তলিয়ে যেতে দেখে অনেক কৃষক ভোর বেলায় জমিনে ধান কাটতে নেমে গেছে। পানিতে অধিকাংশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তার মধ্যেও যতটুকু সম্ভব ফসল বাঁচানোর চেষ্টা করছে কৃষকরা।বৃহষ্পতিবার দুপুরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। ধান কাটার শ্রমিক না পেয়ে অনেক কৃষক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধানেও একজন শ্রমিক মিলছে না। একদিকে শ্রমিকসংকট, অন্যদিকে জ্বালানিসংকট সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জমিতে পানি জমে থাকায় হার্ভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
পানিতে ভেজা ধান কেটে আঁটি বেঁধে খেতের পাশে উঁচু জমিতে রাখছে। আবার কেউ কেউ ধান কেটে নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় করে রাস্তায় নিয়ে রাখছে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ফুলের নাউড়ি গ্রামের কৃষক ইউছুফ বৃষ্টির মধ্যে জমিতে ধান কাটছিলেন। ফসলের কথা জানতে চাইলে তিনি কাস্তে হাতে পানিতে ডোবা জমির দিকে দেখিয়ে বলেন, ‘হাজার হাজার টাকা জমিতে পুঁজি দিয়েছি। নিজে ও শ্রমিক দিয়ে দিন-রাত খাইটা বোরোধান চাষ করেছি। চোখের সামনে পাকা ধান ডুইব্যা গেল। অল্প কিছু ধান কাটতে পারছি। এখন না খাইয়া থাকতে হইব আমাগো।’
লাকসাম উপজেলার নাড়িদিয়া গ্রামের কৃষক নাজির শাহ নাজমুল বলেন, ‘সারা বছর কষ্ট করে ধান ফলিয়েছি। ঋণ করে বীজ, সার সব কিনেছি। এত কষ্টের ধান কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেল। এখন সংসার চালাব কীভাবে।ঋণ শোধ করব কী দিয়ে কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শ্রীয়াং গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ১৮ গণ্ডা জমির মধ্যে মাত্র দুই গণ্ডা ধান কেটে খোলায় তুলেছি, কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা পচে যাচ্ছে। জমিতে পানি থাকায় মেশিন ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না, তাই জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা যোবায়ের আহমেদ জানায়, চলতি বছর ১২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। গ্রীষ্ম কালীন শাক সব্জি আবাদ করা হয়েছে ৩ শত ৯৫ হেক্টর জমিতে।
লাকসাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, চলতি বছর ৮ হাজার ৭১৫ হেক্টর বোরো জমি আবাদ করা হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩৯ হাজার ৪৭৫ মেট্রিক টন চাল। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দুইটি উপজেলায় কমপক্ষে ৪ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমির ধান বৃষ্টিতে হেলে পড়েছে। অপরদিকে বৃষ্টিতে ১৭ হেক্টর জমির সবজি আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি অফিস। তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
Leave a Reply