
কুড়িগ্রামের উলিপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দুর্ঘটনার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভবনের দেয়ালে ভয়াবহ ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে এসেছে। বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, আর সামান্য আতঙ্কেই কেঁপে ওঠে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যেকোনো সময় ভবনের অংশ ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রেখে বাধ্য হয়ে বারান্দায় চলছে ২১৩ শিশুর পাঠদান।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বামনাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি ১৯৯৪ সালে নির্মিত। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২১৩ জন শিক্ষার্থী, ৮ জন শিক্ষক ও একজন নৈশপ্রহরী রয়েছেন। কিন্তু প্রায় চার বছর ধরে ভবনটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছে পুরো বিদ্যালয় পরিবার।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে লোহার রড বেরিয়ে এসেছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রেখে বারান্দায় ক্লাস নিতে হচ্ছে। ফলে প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি, ধুলাবালি ও বাইরের শব্দে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থী নিরব মিয়া, পুজা রাণী, রায়হান, উদিতা রাণী সরকার, ফাহিম, সালমা আক্তার জানায়, “স্কুল ভবনের ভেতরে বসতে ভয় লাগে। বৃষ্টি হলে বই-খাতা ভিজে যায়, রোদে বারান্দায় বসে ঘেমে যাই। ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারি না।”
অভিভাবক পুতুল চন্দ্র মোহন্ত বলেন, “নতুন ভবন না হলে শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
অভিভাবক বৃষ্টি রানী বলেন, “বারান্দায় ক্লাস করায় আমার সন্তান প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার অভাবে নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। এত আবেদন করেও কেউ যেন দেখছে না।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নিপা রাণী সরকার বলেন, “প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে বাধ্য হয়ে বারান্দায় ক্লাস নিচ্ছি। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, আমরাও চরম ভোগান্তিতে আছি।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. ছামছুন্নাহার বেগম বলেন, “ভবনটি প্রায় চার বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এমপি ও শিক্ষা কর্মকর্তার কাছেও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।”
তবকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুশান্ত কুমার বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। নতুন ভবনের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নার্গিস ফাতিমা তোকদার বলেন, “বিদ্যালয়টির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। শুধু এই বিদ্যালয় নয়, উলিপুর উপজেলায় মোট ৪৯টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। নতুন ভবনের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরে আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই নির্মাণকাজ শুরু হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনা ঘটার পর নয়—তার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি নতুন ভবনের অপেক্ষায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠ নিতে হচ্ছে শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে।