
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের গুঞ্জন চলছে। একইসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তরের আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ অথবা ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের গুঞ্জন চলছে। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন রাজপথের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা বেশ কয়েকজন নেতা। তাদের সবাই রাজনীতি করতে অসংখ্য মামলার শিকার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।
এতে শুধু তারা নয় বরং তাদের পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব নেতাদের কাউকে কাউকে না পেয়ে তাদের পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেকের বাবা-মা সন্তানের চিন্তায় গুরুতরভাবে অসুস্থ ও চিরদিনের জন্য শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন।
এদিকে, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নতুন কমিটিতে পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন ওই সব ত্যাগী নেতারা। তারা চান দ্রুত ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নতুন কমিটি দিয়ে সংগঠন গতিশীল করা হোক।
এর আগে, ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি সাবেক ছাত্রনেতা জহির উদ্দিন তুহিনকে সভাপতি ও সাদ মোর্শেদ পাপ্পা শিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এখন ওই কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদে আলেচনায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ২৪ অক্টোবর মো. শেখ ফরিদ হোসেনকে সভাপতি ও মহসিন সিদ্দিকী রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেই কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পথে। এর মধ্যে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় অনুকূল পরিবেশে কমিটি ঘোষণার দাবি জোরালো হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভিড় করা নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সহ-সভাপতি মো. হানিফ তপন, বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. লিটন মাহমুদ বাবু, সাধারণ সম্পাদক মহসিন সিদ্দিকী রনি, সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক রুহুল আমিন সোহেল।
তাদের মধ্যে মো. হানিফ তপন মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের বর্তমান কমিটির নেতাদের চেয়েও তিনি সিনিয়র। মিরপুর এলাকার বিএনপি পরিবারের সন্তান মো. হানিফ তপন বিগত দিনে আন্দোলন করতে গিয়ে ২৫টি মামলার শিকার হন। এক সময় তাকে ধরতে না পেরে তার বাবাকে অনৈতিকভাবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তৎকালীন ওসি সালাউদ্দিন।
এ ছাড়া, স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. লিটন মাহমুদ বাবু আগের কমিটিরও সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে ২৭টি মামলার শিকার হন। আর একই কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রুহুল আমিন সোহেল ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সদস্য সচিব ছিলেন। তিনি বিগত দিনে ৪৭টি মামলার শিকার হন এবং চারবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত ছাড়াও বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হন।
অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সহ সভাপতি মো. আব্দুল জলিল, বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদ মোর্শেদ পাপ্পা শিকদার, সিনিয়র যুগ্ন সম্পাদক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন রিন্টু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা।
তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সভাপতি মো. আব্দুল জলিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৫ থেকে ২০টি মামলার শিকার হন এবং চারবার কারাবরণ করেন। বিগত দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বারবার বাসায় এসে সন্তানকে গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে স্টোক করেন তার আব্দুল জলিলের পিতা। তিনি এখনও শয্যাশায়ী।
এ ছাড়া, বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ন-সম্পাদক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন রিন্টু আগের কমিটির যুগ্ন সম্পাদক ছিলেন এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তিনি বিগত দিনে আন্দোলন করতে গিয়ে ২৭টি মামলার শিকার হন।
আলোচনায় থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের আরেক শীর্ষ পদপ্রত্যাশী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা জুলাই আন্দোলনে বাম চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখের আলো হারান, তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য ৫ বার গিয়েছেন, দ্বিতীয় অপারেশনে অপসারণ করা লেন্সে ও চোখের ভিতরে দেওয়া সিলিকন লিকুইড অপসারণের জন্য আরও কমপক্ষে দুইটি অপারেশন করতে হবে। ২০২৪ সালে ২৯ জুলাই ঢাকা অবরোধে ধোলাইখালের স্পটে বহু চেষ্টা করেও সরাতে না পেরে সরাসরি সুজনকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এর আগে, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রামে আরও দুইবার তার উপর গুলিবর্ষণ করা হয়।
এরমধ্যে ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি পেছানোর প্রতিবাদে তাঁতিবাজারের মিছিলে গুলি করলে সেই গুলি রিকশায় লেগে তার পায়ে এসে আঘাত করে। তিনি বিগত দিনে আন্দোলন করতে গিয়ে অসংখ্য মামলার শিকার হন।
আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মো. শেখ ফরিদ হোসেন বলেন, ঈদের আগে-পরে প্রায় সব সংগঠন ঢেলে সাজানো পরিকল্পনা করছেন আমাদের দলের চেয়ারম্যান, তখন স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের বিষয়ে তিনি হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত দিবেন। সেটাই হবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিষয়ে পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন বলেন, বর্তমান কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারলে ভালো হতো। আমাদের দলের চেয়ারম্যান মহোদয় রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় দেরি হচ্ছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেটাই হবে বলেও জানান তিনি।
স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, সাধারণত স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটি গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় আসে। এবারও হয় তো তাই হবে বলে জানান তিনি।