
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরশহরের ব্যস্ততম এলাকায় মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এখনো রহস্যজনক। প্রতিবেশী ও স্বজনদের কেউ পুরোনো আক্রোশ, আবার কেউ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে সন্দেহ করছে। তবে পুলিশ এখনো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।এ ঘটনায় পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ হোসেন সিফাত বাদী হয়ে শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রায়পুর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। এতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার (২৮) কে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া।
ঘটনার কারণ এবং এতে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতদের স্বজনরা।
রায়পুর পৌর বণিক সমিতির সভাপতি ও সিফাতের দোকান মালিক সফিকুল ইসলাম মুরাদ বলেন, নিহত শাহিনুর বেগমকে বাসার মালিক আমির হোসেন মাস্টার খুব বিশ্বাস করতেন। তিনি ওই ভবনে না থাকলেও চারতলা ভবনের সব ভাড়াটিয়ার মাসিক ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব শাহিনুরের ওপর দিয়েছিলেন। ফলে প্রতি মাসে তার কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা জমা থাকত। পূর্বের ভাড়াটিয়া হিসেবে অন্তর মজুমদার বিষয়টি জানতো। তার ধারণা, টাকার লোভেই অন্তর ওই বাসায় প্রবেশ করে।
প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভাষ্য, টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করতেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, নিহতদের মরদেহ নিতে বৃহস্পতিবার রাতেই কুমিল্লা থেকে লক্ষ্মীপুরে ছুটে আসে শাহিনুরের বাবা দাদন মিয়া, ভাই ছানা উল্যা ও দেবর জামাল হোসেনসহ স্বজনরা। শুক্রবার দুপুর ১২টায় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে মা ও তিন মেয়ের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বাদ জুমা রায়পুরের পৌর দেনায়েতপুর এলাকার ভাড়া বাসার সামনে জানাজা শেষে মরদেহগুলো কুমিল্লার নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে হোমনা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নটিয়া গ্রামের সরকার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহত শাহিনুরের ভাই ছানা উল্যা বলেন, যতবার বোনকে সংসার নিয়ে আমাদের বাড়িতে যেতে বলেছি, ততবারই সে বলেছে রায়পুরেই ভালো আছে। এখানে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা অনেক সহযোগিতা করে। ছেলে-মেয়েরা ভালোভাবে মানুষ হবে বলেই সে এখানে থাকতে চেয়েছিল। অথচ যেখানকে সবচেয়ে নিরাপদ ভেবেছিল, সেখানেই মেয়েদের নিয়ে তার জীবন শেষ হলো।
তিনি আরও বলেন, আমাদের জানামতে, রায়পুরে তাদের কোনো শত্রু ছিল না। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
শাহিনুরের দেবর জামাল হোসেন বলেন, আমার ভাবি খুব ভালো মানুষ ছিল। ভাতিজিরাও মেধাবী ও অমায়িক ছিল। হঠাৎ এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল, কিছুই বুঝতে পারছি না।
নিহত শাহিনুরের বাবা দাদন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আমার মেয়ে ও নাতনিদের কেন এভাবে মরতে হলো? তারা তো কোনো দোষ করেনি। একমাত্র নাতিটা এখন পৃথিবীতে একা হয়ে গেল।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের প্রধান করা হয়েছে রায়পুর থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল মান্নানকে।
রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছেনি ও পাটার শিল উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) অরুপ পাল বলেন, চারজনের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের মাথা, বুক ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। নিহত অন্তরের সুরতহাল এখনো হয়নি। সুরতহাল শেষে তার মরদেহেরও ময়নাতদন্ত করা হবে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা ডাকাতিয়া নদীপাড় সড়কের আমির হোসেন মাস্টারের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার বাসায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দা আফরোজা বেগম রানী জানালা দিয়ে এক ব্যক্তিকে দেখতে পান এবং বাইরে থেকে গেট বন্ধ করে দেন। এতে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে। পরে তিনি আশপাশের লোকজনকে খবর দিলে স্থানীয়রা বাসায় ঢুকে রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে।
একপর্যায়ে অন্তর ভবনের ছাদে উঠে পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে ধরে গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়রা জানায়, প্রায় দেড় বছর ওই ভবনের পঞ্চম তলায় ভাড়া থাকত অন্তর মজুমদার। প্রায় আট মাস আগে সে বাসা ছেড়ে চলে যায়। বাসাভাড়ার টাকা শাহিনুরের কাছে জমা থাকত এবং তার কাছে কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল বলে অন্তর জানত। এ কারণে ডাকাতির উদ্দেশ্যেই সে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে স্হানীয়রা ধারণা করছে।