
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউতায় মুসলিম বাসিন্দারা বর্তমানে তীব্র বর্ণবাদী আচরণ ও বিদ্বেষের সম্মুখীন হচ্ছেন। মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসনপ্রত্যাশীর সীমান্ত অতিক্রমের পর স্থানীয় মুসলিমদের প্রতি সন্দেহের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করা সত্ত্বেও অনেকের নাগরিক পরিচয় ও আনুগত্যকে ছোট করে দেখা হচ্ছে, যা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। আবার কিছু বার্তায় তাদের শহর থেকে বহিষ্কারের দাবিও জানানো হয়।
সিদি এমবারেক এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনের নেতা আবদেল্লাহ মুস্তাফার কাছে প্রতিদিন অসংখ্য ফোন আসছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে কোনো কোনো দিন তিনি ৪০টি পর্যন্ত কল পাচ্ছেন। গত জুলাই মাসে মরক্কো থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনের পর থেকেই মুসলিম বাসিন্দারা বর্ণবাদের অভিযোগ নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এমনকি বাসস্টপে ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষারত এক মুসলিম নারীকে অশালীন গালিগালাজ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে তাকে ‘মোরা’ বলে সম্বোধন করা হয়। ভুক্তভোগী নারীর স্বামী এ বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ওই ব্যক্তি তাকে অবমাননাকর ভাষায় ‘মোরা’ বলে গালাগাল করেন। পরে কী ঘটেছে, তা জনসমক্ষে তুলে ধরতে পরিবারটি মুস্তাফার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা আমাকে ফোন করে, কারণ তারা চায় আমি যেন এসব বন্ধে ভূমিকা রাখি।’।
মুস্তাফার মতে, সিউতার বাসিন্দারা শহরটিকে বিভক্ত করতে চায় না। তিনি নিজে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তা না হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিটির হয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি সিউতার স্বায়ত্তশাসিত সরকারের প্রধান ও পিপলস পার্টির (পিপি) জ্যেষ্ঠ নেতা হুয়ান হেসুস ভিভাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন। তবে তার অভিযোগ, মুসলিমদের উদ্বেগের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে ভিভাস ব্যর্থ হয়েছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভিভাস জুলাইয়ের অভিবাসন ঢেউকে ‘আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং মরক্কোর ওপর ‘হয়রানিমূলক নীতি’ অনুসরণের দায় চাপিয়েছিলেন। মুস্তাফার দাবি, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা হুয়ান ভিভাস নিজের অনুকূলে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। আগস্ট মাসের এক শনিবার মুস্তাফা সতর্ক করেছিলেন যে, ভিভাসের এই ধরনের বক্তব্য মুসলিম ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। মুস্তাফার আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে শারীরিক ও বর্ণবাদী হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায়। তার ভাষায়, ‘শহর কর্তৃপক্ষ যে বক্তব্য ছড়াচ্ছে, তা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং অন্যদেরও সেই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করতে উৎসাহিত করছে। পরে তাদের অধিকাংশই ফিরে গেলেও থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের আশ্রয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকটে পড়ে শহর কর্তৃপক্ষ। বাস্তুচ্যুতদের কেউ কেউ আশপাশের বনাঞ্চলে আশ্রয় নেন। মুস্তাফা ঘটনাটি প্রকাশ্যে তুলে ধরেন এবং সাংবাদিকদের নজরে আনেন।
মুস্তাফা মনে করেন, শহর কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত বক্তব্য বিদ্বেষকে আরও বৈধতা দিচ্ছে।
তিনি সহাবস্থান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিলেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি। তিনি বলেন, ‘সহাবস্থান উন্নত করার প্রস্তাব নিয়ে আমরা যখনই তার কাছে গিয়েছি, তিনি কখনো আমাদের কথা শোনেননি।’। তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্য কারও সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে না।
পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সিউতায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী অবস্থান করছিলেন, যাদের অনেকেই মানবেতর অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন।
গত ৯ আগস্ট চার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আয়োজিত এক বিক্ষোভে পাঁচ হাজার মানুষ অংশ নিয়ে এই পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানান। আমি কাউকে আমার সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করতে দেব না।
অন্যদিকে, নুক্লেও নাসিওনাল নামে একটি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর ২০ জন সদস্যের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের উত্তেজনার সময় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
সিউতার মুসলিম বাসিন্দাদের ওপর এমন আক্রমণ নতুন কিছু নয়; মসজিদ বন্ধের দাবির মতো পুরোনো ঘটনাগুলো এর প্রমাণ। ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীসহ দুই মুসলিম বাসিন্দার ওপর হামলার ঘটনায় তাকে ‘যক্ষ্মা রোগ বহনকারী’ বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। বর্ণবাদ ও বিদেশিবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্যমতে, বিপুল অভিবাসনপ্রত্যাশীর আগমনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি বর্ণবাদ প্রকাশের একটি সহজ উপায়।’।
শহরটির ৮৩ হাজার ৬৬৪ জন বাসিন্দার প্রায় ৪৩ শতাংশই মুসলিম। সিহাম আবদেল্লাহর মতো বাসিন্দারা, যাদের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে স্পেনের সামরিক বাহিনীতেও দায়িত্ব পালন করেছে, তারা এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে চরম হতাশ। সিহামের মতে, কিছু মানুষ এখন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন বিক্ষোভে ‘চোরিসো সসেজভর্তি মেশিনগান’ ব্যবহারের মতো উসকানিমূলক আহ্বানও শোনা যাচ্ছে, যা সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্য বহন করে। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে সিউতায় কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশ হাজার মানুষ প্রবেশ করেন। তাদের দাবি ছিল নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা। সিহাম আবদেল্লাহর বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং তাদের আগের প্রজন্মের সদস্যদেরও জন্ম সিউতায়। সিহাম বলেন, ‘জনসংখ্যার একটি অংশ এত দিন আমাদের উদ্দেশে সবচেয়ে খারাপ কথাগুলো বলার অপেক্ষায় ছিল। চোরিসো স্পেনের একটি জনপ্রিয় সসেজজাতীয় খাবার।
নাইব নামের এক স্থানীয় ফুটবল কোচ, যিনি স্পেনের পঞ্চম প্রজন্মের নাগরিক, তিনিও নিজের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কিত। তার মেয়েদের হিজাব পরিহিত হওয়ার কারণে নিয়মিত সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কেউ তাকে স্প্যানিশ পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না। সমাজবিজ্ঞানী ভিক্তর আলবার্ট-ব্লাঙ্কোর মতে, স্পেনের জাতীয় পরিচয়ের সাথে ক্যাথলিক ধর্মের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তা অনেক সময় মুসলিম ও স্প্যানিশ পরিচয়ের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি করে। মরক্কোর নৈকট্য ও সংকটের সময়ে এই কাঠামোগত বাস্তবতাগুলোই মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বড় ধরণের সামাজিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অক্টোবরের শুরুর দিকে স্পেনের রাজপরিবারের বিরল এক সফরের আগে সৈকতসংলগ্ন অস্থায়ী শিবিরগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সংকটের মধ্যে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সিউতার মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এই বিদ্বেষের বিষয়টি শুধু বর্ণবাদী আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজেদের দেশ ও পরিচয়ের স্বীকৃতির প্রশ্ন।