1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ভারতের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা - আজকের কাগজ
বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৫:২৬ অপরাহ্ন

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ভারতের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬ ৯:০৫ পিএম
শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে গত ১৫ বছর ধরে একটি অলিখিত নিয়ম যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল—যেকোনো পরিস্থিতিতেই টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবেন মমতা ব্যানার্জি ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে গত সোমবার সেই নিয়মের অবসান ঘটল।

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে এই জনমোহিনী নেত্রীর হার তার টানা চতুর্থবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। জয়ী হলে তিনি জ্যোতি বসু কিংবা নবীন পট্টনায়কের মতো দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক মহীরুহদের পাশে নিজের নাম লেখাতে পারতেন।

মমতার এ পরাজয় সমসাময়িক ভারতের অন্যতম বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল। যে রাজনীতির শুরু হয়েছিল রাজপথের আন্দোলন দিয়ে, তার পরিণতি হলো নিজের গড়া রাজনৈতিক দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে।

সুতি শাড়ি আর সাধারণ রবারের চটি পরা ছোটখাটো গড়নের মমতাকে দেখে একসময় কল্পনাও করা যায়নি যে, তিনি বিশ্বের দীর্ঘতম গণতান্ত্রিক বাম শাসনের পতন ঘটাবেন। কিন্তু ২০১১ সালে টানা ৩৪ বছরের সিপিএম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেন। সে সময় নিউইয়র্ক টাইমস তাকে ‘বার্লিন দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হাতুড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। আর টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছিল।

কলকাতার এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মমতা ছাত্রাবস্থাতেই কংগ্রেসের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। নব্বইয়ের দশকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজপথে বাম-বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৯০ সালে এক মিছিলে সিপিএম ক্যাডারদের হামলায় তার মাথার খুলি ফেটে গিয়েছিল। ওই ঘটনা মমতাকে একজন ‘লড়াকু’ ও ‘ত্যাগী’ নেত্রীর ইমেজ দেয়, যা তিনি ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও ধরে রেখেছিলেন।

২০০৭ সালে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মমতা কৃষকদের মসিহা হয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসে ডাকতে শুরু করে ‘দিদি’। ভারতের অন্যান্য প্রভাবশালী নারী নেত্রীদের মতো তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক বংশপরিচয় বা গডফাদার ছিল না। একক শক্তিতেই তিনি তিন মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন।

মমতার ক্যারিশমা, নারীদের জন্য কল্যাণমুখী প্রকল্প এবং বাঙালি আঞ্চলিকতাবাদ দীর্ঘদিন তাকে দুর্নীতির অভিযোগ ও বিজেপির উত্থানের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে একটি রাজনৈতিক কাঠামো আজীবন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

তৃণমূলের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল এর ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল’। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেছিলেন, মমতার দলে স্থানীয় প্রভাবশালী ও নিচুতলার নেতাদের আনুগত্যের বিনিময়ে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতির আকাঙ্ক্ষা এবং আর্থিক লাভের তাড়না তৃণমূলের নৈতিক রাজনীতির ভিত দুর্বল করে দেয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল রাজ্যের তীব্র আর্থিক সংকট। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে তোলাবাজি এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত মমতার সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়।পরাজয়ের পর মমতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দল ধরে রাখা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাস বলে, শাসক দল হারলে নেতা-কর্মীরা দ্রুত ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের বড় একটি অংশ বিজেপির দিকে চলে যেতে পারে, যা দলের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরাতে পারে।

৭১ বছর বয়সী এই নেত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই শেষ কথা বলা হয়তো ঠিক হবে না। তবে তার জন্য সামনে এক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সায়ন্তন ঘোষ বলেন, ‘আটের দশকের শেষ দিক থেকে মমতা কখনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব ছাড়া থাকেননি। ক্ষমতা ছাড়া মমতা—এটি বাংলার রাজনীতিতে বিরল দৃশ্য।’

পরাজয়ের পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগের সেই মেজাজেই দেখা গেছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এখন মুক্ত বিহঙ্গ, একজন সাধারণ মানুষ। আমার আর কোনো চেয়ার নেই।’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে হারিনি। আমাদের কাছ থেকে জোর করে জয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি যেকোনো জায়গায় যেতে পারি, যেকোনো জায়গায় লড়াই করতে পারি। আমি আবারও রাজপথেই থাকব।’

মমতার এ বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি আবারও হয়তো সেই পুরনো চেহারায় ফিরবেন—যিনি রাজপথের লড়াই দিয়েই এক সময় বাংলার মানুষের মন জয় করেছিলেন। তবে তিনি কি পারবেন নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে, নাকি ইতিহাসের পাতায় এক পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ হিসেবে রয়ে যাবেন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: বিবিসি

এই বিভাগের আরো খবর