
একসময় খরাপ্রবণ ও অনুর্বর হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্রভূমির মাটিতেই এখন দোল খাচ্ছে সম্ভাবনার প্রতীক—আমের মুকুল। নওগাঁর সাপাহার উপজেলায় আমগাছে গাছে মুকুলের সমারোহে নতুন মৌসুমকে ঘিরে আশায় বুক বাঁধছেন চাষি, ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) উপজেলার নুরপুর গ্রামের একাধিক আমবাগান ঘুরে দেখা যায়, সবুজ পাতার আড়ালে মুকুলে ভরে উঠেছে গাছের ডালপালা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাপাহার বাজারকে কেন্দ্র করেই এখানকার আম দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে সরবরাহ হয়। ফলে এই সময়ের মুকুলের অবস্থা পুরো মৌসুমের উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।
সদর ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের আমচাষি মো. বারিক আলী বলেন,“এ বছর এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছে ভালো মুকুল এসেছে। সামনে কয়েক দিনের মধ্যেই পুরোপুরি মুকুল ফুটে উঠবে বলে আশা করছি। নিয়মিত পরিচর্যা চলছে। তবে অকাল ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে।” তার মতো সাপাহারের হাজারো চাষির কাছে এই মুকুল কেবল ফুল নয়—এটাই তাদের বছরের মূল আয়ের উৎস, সংসারের স্বচ্ছলতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মো. হাসান আলী বলেন, সাপাহারের আমের চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। মুকুল ভালো হলে আগাম অর্ডার ও বাজার প্রস্তুতির কাজ শুরু করা যায়। আমরা এখন থেকেই বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
সাপাহার আম আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিফাত হোসেন জানান, সাপাহার এখন আমের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। মুকুলের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর আমের বাজার ভালো যাবে বলে আমরা আশা করছি। তিনি আরও বলেন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় আড়তদাররা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ ও বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাপাহার বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র। প্রতিবছর আম মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাপাহারে প্রায় ৯ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সাপাহারে উৎপাদিত আমের মধ্যে ‘রুপালি’ জাত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। প্রায় ৭৫ শতাংশ বাগানেই এই জাতের আম চাষ হচ্ছে। এছাড়াও গুটি, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হিমসাগর (খিরসাপাত), ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, কাটিমনসহ দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১৫/১৬ জাতের আম উৎপাদিত হয়। এখানকার আমের সুনাম ইতোমধ্যে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছেছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, মুকুলের পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অকাল ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, রোগবালাই ও বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি অফিস নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সাপাহারের আমবাগানে আজ যে মুকুল দুলছে, তা শুধু ঋতু পরিবর্তনের বার্তাই নয় এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। সময়মতো পরিচর্যা, আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানিমুখী অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ‘আমের বাণিজ্যিক রাজধানী’ সাপাহার দেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
Leave a Reply