1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্র ধুলোয়, বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীর বাড়তি খরচ - আজকের কাগজ
মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪০ পূর্বাহ্ন

কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্র ধুলোয়, বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীর বাড়তি খরচ

মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৪৭ পিএম
শেয়ার করুন

একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর ধুলো জমে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে একটি ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষার জন্য দরিদ্র রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে হওয়ার কথা যে পরীক্ষা, সেটির জন্য গুনতে হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি টাকা। একই সঙ্গে ভয়াবহ চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ধুঁকছে কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সীমান্তবর্তী এই জেলার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) যন্ত্রপাতি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, ইটিটি, এন্ডোস্কোপি, ল্যাপারোস্কপি, পোর্টেবল এক্স-রে, ডায়াথার্মিসহ ১৯৩টি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ছয় থেকে সাত বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও ধুলার স্তর, কোথাও মরিচা ধরার উপক্রম। কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়। ২০১৯ সালে যন্ত্রপাতি গ্রহণের পর প্রায় ১২ কোটি টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হলেও অধিকাংশ যন্ত্র আজও রোগীদের সেবায় ব্যবহার করা হয়নি।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, যন্ত্র সচল না থাকলেও ২০২৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সেগুলো চালু দেখিয়ে বকেয়া বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রায় এক বছরেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। একই সঙ্গে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্র কেনা এবং বকেয়া বিল ছাড়ে তদবিরের অভিযোগও উঠেছে।
এক মাস চালু, তারপরই বন্ধ ইকো সেবা
২০২৩ সালে হাসপাতালের বহুল প্রত্যাশিত ইকোকার্ডিওগ্রাফি সেবা চালু হলেও মাত্র এক মাসের মাথায় পাসওয়ার্ড জটিলতায় মেশিনটি অচল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে সরকারি হাসপাতালে ২০০ থেকে ৮০০ টাকায় হওয়ার কথা যে পরীক্ষা, সেটির জন্য রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে আরও অর্ধশতাধিক হৃদরোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ ইকো ও ইটিটি কক্ষ তালাবদ্ধ।
উলিপুর উপজেলার কাশেম মিয়া বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি থেকেও বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। দুইবার ইকো করাতেই প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এত টাকা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
হৃদরোগী মাহফুজার রহমান রাজু বলেন, “বুকে ব্যথা বাড়লেই ইকো করতে হয়। সরকারি হাসপাতালের মেশিন চালু থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এত ভোগান্তি হতো না।”
কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান থাকলেও মেশিন সচল না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
২৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র ২০ জন
যন্ত্রপাতির পাশাপাশি জনবল সংকটও ভয়াবহ। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৩৭১ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। ৩৪০ জন নার্সের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৬০ জন।
প্রতিদিন গড়ে ৫০০-এর বেশি ভর্তি রোগী এবং এক হাজারের বেশি বহির্বিভাগের রোগীকে এই সীমিত জনবল দিয়েই সেবা দিতে হচ্ছে। ফলে অনেক রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও কার্ডিওলজি বিভাগে কোনো সিনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। অ্যানেসথেসিয়া, অর্থোপেডিকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চিকিৎসক না থাকায় ইএনটি বিভাগের সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
নতুন ভবন আছে, আইসিইউ নেই
আটতলা নতুন ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে এখনো আইসিইউ ও এনআইসিইউ চালু হয়নি। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পথে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ছয়টি ইসিজি মেশিনের মধ্যে রয়েছে মাত্র তিনটি। দুটি এক্স-রে ও দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল মাত্র একজন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১৫০ জন কর্মী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৭ জন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, সীমিত জনবল নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ইকো ও ইটিটি মেশিন দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূরে নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ায় পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না। আগের দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণেই সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কুড়িগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাবে জেলার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, অচল চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল এবং আইসিইউ-এনআইসিইউ চালুর দাবি জানান।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটি কোটি টাকার সরকারি চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল করার বিকল্প নেই।

এই বিভাগের আরো খবর