
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ডাকা ধর্মঘটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত চলমান এই কর্মবিরতির ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর বা মৃত ব্যক্তির মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রাখার জন্য তারা কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, তার বড় ভাগিনা মো. রাসেল (২২) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নেওয়ার গাড়ি না পেয়ে অসহায়ের মতো বসে আছি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন জানান, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই হাসপাতাল থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের জায়গা পরিষ্কার, সিসি ক্যামেরা ও গেট স্থাপনের কাজ মালিকরাই করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে সেই স্থান থেকেও তাদের গাড়ি সরিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি রাস্তায় গাড়ি রাখলেও ট্রাফিক সার্জেন্টদের মামলার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেও তাদের গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়। শাহাদাত হোসেন বলেন, রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স রাখলেও পুলিশের সার্জেন্ট মামলা দেন।
শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, পার্কিংয়ের সুনির্দিষ্ট দাবির পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত রাজস্ব দিয়ে গাড়ি রাখার সুযোগ চেয়েছেন তারা। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান না হবে, ততক্ষণ ধর্মঘট চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এই সংকটের বিষয়ে জানতে একাধিকবার পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভুক্তভোগী স্বজনদের দুর্ভোগের চিত্র ছিল স্পষ্ট।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. শাহীন জানান, তার ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগম নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মারা যান। কিন্তু মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি। সরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্সও সেখানে পাওয়া যাচ্ছিল না। একই রকম অসহায় অবস্থার কথা জানান যাত্রাবাড়ীর মনির হোসেন। তার ভাগিনা মো. রাসেল বিকেল ৫টার দিকে মারা গেলে মরদেহ বহনের গাড়ি না পেয়ে তাকে ভ্যানে করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শোকাতুর পরিবারের সদস্য হিসেবে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া তাদের কাছে ছিল অকল্পনীয়। শাহীন বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি।
খুলনা থেকে আসা আব্দুল আহাদ জানান, গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে তিনি কিডনি হাসপাতালে রেফার্ড হওয়ার পর থেকেই অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছেন। কিন্তু দুপুর থেকে চেষ্টা করেও কোনো সমাধান পাননি। সঠিক সময়ে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারী জানান, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেকে অটোরিকশা, সিএনজি কিংবা পিকআপ ভ্যানে করে রোগী ও মরদেহ নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরে এবং বাইরের দিকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন অসংখ্য মানুষ। এখানে পরিচালকের উচিত অ্যাম্বুলেন্স নেতাদের সঙ্গে বসে এই বিষয়টি সমাধান করা।