1. ajkerkagojbd22@gmail.com : Ajker Jagoj : Ajker kagoj
  2. asikkhancoc085021@gmail.com : asikengg :
  3. minniakter1@gmail.com : minni akter : minni akter
বিএনপির কোণঠাসা প্রবীণ নেতারা ঠাঁই পেতে পারেন মন্ত্রিসভায় - আজকের কাগজ
সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:৩০ পূর্বাহ্ন

বিএনপির কোণঠাসা প্রবীণ নেতারা ঠাঁই পেতে পারেন মন্ত্রিসভায়

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬ ৯:৫৩ পিএম
শেয়ার করুন

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো মামলা, অমানবিক নির্যাতন আর জেল-জুলুম পার করে অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। তবে দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলেও দলের ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ।

রাজপথের অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতা আজ নিজেদের দলেই ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তরুণদের প্রভাব বাড়তে থাকায় অভিজ্ঞরা পড়ছেন ছিটকে।
তবে হতাশার এই ঘোর অন্ধকারের মাঝেই উঁকি দিচ্ছে নতুন আশার আলো।
জানা গেছে, ঈদুল আজহা ও বাজেট অধিবেশনের পর মন্ত্রিসভার যে সম্প্রসারণ হতে যাচ্ছে, সেখানে দলের এই ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের মূল্যায়নের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১২ ফেব্রুয়ারির বিপুল নির্বাচনী বিজয়ের পর যখন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, তখন অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। দলের যে প্রবীণ নেতারা বিগত দেড় যুগ ধরে বুক চিতিয়ে দলকে আগলে রেখেছিলেন, তাদের অনেকেই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ছয়জন পূর্বে বিএনপি সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো হেভিওয়েট নেতারা প্রথম দফার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন। পরবর্তীতে মির্জা আব্বাসকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়নি। প্রবীণ নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার করে কার্যত দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে তিনি স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার ও দলের নীতিনির্ধারণীতে এখন লন্ডনভিত্তিক তরুণ নেতাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সরকার বা দল পরিচালনার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা এখন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সিনিয়র নেতার মতে, তারেক রহমান বিশ্বাস করেন বিদেশ থেকে শিক্ষিত এই তরুণরা আরও আধুনিক ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা নিয়ে এসেছেন এবং দলের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তারাই বেশি যোগ্য। একসময় প্রভাবশালী থাকা সিনিয়র নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অস্বস্তিবোধ করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র নেতার ভাষায়, ‘পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চেয়ারম্যান নিজেই বয়স্কদের অবসরে পাঠাচ্ছেন’। এই পরিবর্তনের আভাস পেয়ে খোদ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বয়সের কারণ দেখিয়ে শিগগিরই অবসরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, “আমার বয়স বাড়ছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছি। এখন একটি পরিবর্তন দরকার।”

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে দেড় লাখ মামলায় আসামি করা হয়েছে। যাদের অনেকেই আজ নিস্ব। বাড়িঘর, জমিজমা, এমনকি গবাদিপশু বিক্রি করে, ঢাকায় রিকশা চালিয়েও অনেকে আন্দোলনের খরচ জুগিয়েছেন। আতঙ্কে অসংখ্য রাত কেটেছে ধানখেতে, খোলা আকাশের নিচে, সুপারি বাগানে কিংবা কবরস্থানে।

দলের অনেক ত্যাগী নেতার অভিযোগ, দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে ত্যাগের স্বীকৃতি মিলবে, এমন প্রত্যাশা থাকলেও সরকার গঠনের পর তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে নিচ্ছে।

ত্যাগী নেতাদের বঞ্চনার অন্যতম উদাহরণ দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলের হাল ধরা রিজভীকে মন্ত্রী না করে কেবল উপদেষ্টা করায় অনেকেই বিস্মিত। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘ সময় কারাগার ও আদালতে কাটালেও তাকে এখনো কোনো পদে মূল্যায়ন করা হয়নি।

তিন শতাধিক মামলার আসামি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হয়েছে। ২০০১ সালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিদ্ধ আলাল এখনো শরীরে গুলির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। মায়ের মৃত্যুর সময় কারাগারে থাকায় শেষবার মায়ের মুখটাও দেখতে পারেননি। এত ত্যাগের পরও সরকারে তাকে মূল্যায়ন না করায় তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

অবশ্য আলাল এখনো আশাবাদী। তিনি বলেন, “তারেক রহমান নিজে আমাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি সবকিছু অবগত রয়েছেন। চেয়ারম্যান যথাসময়েই দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবেন বলে আমার বিশ্বাস।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “আমাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সবেমাত্র সরকার গঠন হয়েছে। দেশ গঠনের কাজ চলমান। আশা করি একটা সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।”

সরকারের পাশাপাশি দলের ভেতরেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এ বছরের শেষের দিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরবর্তী মহাসচিব হতে পারেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

স্থায়ী কমিটি থেকেও বয়স্ক ও অসুস্থ নেতাদের সরিয়ে তরুণদের জায়গা দেওয়া হতে পারে। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং সেলিমা রহমানকে স্বাস্থ্যগত কারণে স্থায়ী কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া নব্বইয়ের দশকের ছাত্র আন্দোলনের অনেক নেতা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে জায়গা পেতে পারেন।

সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় মূল্যায়নের সম্ভাবনা
প্রাথমিক বঞ্চনা ও হতাশার মধ্যেই দলের ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের জন্য সুসংবাদ হয়ে আসছে আসন্ন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ। সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জনবান্ধব ও প্রশাসনের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহা এবং বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে যাচ্ছে। আর এই সম্প্রসারণেই দলের পোড়খাওয়া ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে।

সূত্রমতে, নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েক দশকের অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান এবং রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের দেখা যাবে। নোয়াখালী অঞ্চল থেকে মন্ত্রিসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ছয়বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।

এছাড়া তৃণমূলের দাবি মেনে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং হাবিবুন নবী খান সোহেলের মতো হেভিওয়েট নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকেও পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

এর বাইরে হুইপের দায়িত্ব পালন করা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পাবনার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক এবং কুমিল্লার অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নামও পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তরুণ ও উদীয়মান নেতাদেরও সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই তালিকায় রয়েছেন খুলনার সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল এবং ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল। পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন দলের মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও দুই-একজনকে মন্ত্রিসভায় আনা হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার পরিচালনার শুরুতেই প্রবীণ ও ত্যাগীদের বাদ দিয়ে তরুণদের ওপর নির্ভরতা দলে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল। তবে তারেক রহমান খুব ভালো করেই জানেন, শুধু তারুণ্যের উচ্ছ্বাস দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রবীণদের মেধা, প্রজ্ঞা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। আসন্ন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ সেই ভারসাম্য রক্ষারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজপথে রক্ত ঝরানো এই প্রবীণ ও ত্যাগী নেতারা যদি সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় যথাযথভাবে মূল্যায়িত হন, তবে দলের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা যেমন দূর হবে, তেমনি দেশ গঠনেও তা এক নতুন মাত্রার যোগ করবে।

এই বিভাগের আরো খবর